ঢাকা ০৭:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুজব-অপতথ্যে ১০ বছর জেল? ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আরও কঠোর করার পথে সরকার

নিজস্ব সংবাদ :

তিন মাস আগে কার্যকর হওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন কিছু ধারা যুক্ত করে আইনটিকে আরও কঠোর করার পাশাপাশি শাস্তির মাত্রাও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন—এই চার ধরনের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি অপরাধের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। অনলাইনে এসব তথ্য প্রকাশ, প্রচার বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।

গুজব ও অপতথ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড

খসড়া সংশোধনে নতুন ২৬/ক ধারা যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাইবার মাধ্যমে কেউ গুজব বা অপতথ্য ছড়ালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে—

  • সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড,
  • সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা,
  • অথবা উভয় দণ্ড।

খসড়ায় গুজব বলতে এমন অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে অপতথ্য বলতে এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করা হয়।

এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্টও অপরাধের আওতায়

সংশোধিত আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, অডিও, ভিডিও, ছবি, গ্রাফিকস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রকাশ বা প্রচার করে কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।

এ ধরনের অপরাধে প্রস্তাবিত শাস্তি—

  • সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড,
  • সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা,
  • অথবা উভয় দণ্ড।

তবে কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এমন কনটেন্ট প্রচার করা হলে শাস্তি বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আইন বাস্তবায়নে বাড়ছে সংস্থার ভূমিকা

খসড়ায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

সরকারি সূত্রের দাবি, এখানে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-কেও অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত রয়েছে, যদিও খসড়ায় সরাসরি নাম উল্লেখ করা হয়নি।

সরকারের যুক্তি: ভুয়া প্রচারণা ঠেকানো জরুরি

নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, বিকৃত অডিও, এআই-নির্মিত ছবি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণেই কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।

উদ্বেগ: আবার কি ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর পথে?

প্রযুক্তি ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে আইনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে

তাদের মতে, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তার স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে

ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন, দ্রুত আইন পাস না করে সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ, আইনজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।

সরকারের ভেতরেও মতভেদ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আইন সংশোধন নিয়ে সরকারের মধ্যেও একক অবস্থান নেই। একদল মনে করছে, অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োজন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, অতিরিক্ত কঠোরতা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার জন্ম দিতে পারে এবং অনলাইন স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

পটভূমি

২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং তা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই আইন বাতিল করা হয়।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে। পরে তা রহিত করে সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬ সংসদে পাস করা হয়। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে ভুয়া তথ্য রোধ করা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত সংশোধন সংসদে কী রূপ পায় এবং তা বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

গুজব-অপতথ্যে ১০ বছর জেল? ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আরও কঠোর করার পথে সরকার

আপডেট সময় ০২:৪৬:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

তিন মাস আগে কার্যকর হওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন কিছু ধারা যুক্ত করে আইনটিকে আরও কঠোর করার পাশাপাশি শাস্তির মাত্রাও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন—এই চার ধরনের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি অপরাধের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। অনলাইনে এসব তথ্য প্রকাশ, প্রচার বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।

গুজব ও অপতথ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড

খসড়া সংশোধনে নতুন ২৬/ক ধারা যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাইবার মাধ্যমে কেউ গুজব বা অপতথ্য ছড়ালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে—

  • সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড,
  • সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা,
  • অথবা উভয় দণ্ড।

খসড়ায় গুজব বলতে এমন অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে অপতথ্য বলতে এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করা হয়।

এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্টও অপরাধের আওতায়

সংশোধিত আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, অডিও, ভিডিও, ছবি, গ্রাফিকস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রকাশ বা প্রচার করে কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।

এ ধরনের অপরাধে প্রস্তাবিত শাস্তি—

  • সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড,
  • সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা,
  • অথবা উভয় দণ্ড।

তবে কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এমন কনটেন্ট প্রচার করা হলে শাস্তি বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আইন বাস্তবায়নে বাড়ছে সংস্থার ভূমিকা

খসড়ায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

সরকারি সূত্রের দাবি, এখানে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-কেও অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত রয়েছে, যদিও খসড়ায় সরাসরি নাম উল্লেখ করা হয়নি।

সরকারের যুক্তি: ভুয়া প্রচারণা ঠেকানো জরুরি

নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, বিকৃত অডিও, এআই-নির্মিত ছবি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণেই কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে।

উদ্বেগ: আবার কি ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর পথে?

প্রযুক্তি ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে আইনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে

তাদের মতে, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তার স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে

ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন, দ্রুত আইন পাস না করে সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ, আইনজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।

সরকারের ভেতরেও মতভেদ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আইন সংশোধন নিয়ে সরকারের মধ্যেও একক অবস্থান নেই। একদল মনে করছে, অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োজন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, অতিরিক্ত কঠোরতা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার জন্ম দিতে পারে এবং অনলাইন স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

পটভূমি

২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং তা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই আইন বাতিল করা হয়।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে। পরে তা রহিত করে সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬ সংসদে পাস করা হয়। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে ভুয়া তথ্য রোধ করা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত সংশোধন সংসদে কী রূপ পায় এবং তা বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়।