ঢাকা ০১:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুর হাতে স্মার্টফোন, নেপথ্যে কি হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব?

নিজস্ব সংবাদ :

বর্তমান সময়ে শিশুদের জীবনেও প্রযুক্তির উপস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ—বিভিন্ন কাজে অল্প বয়সেই মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তারা। কখনো বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে, আবার কখনো শিশুর নামেই খুলে দেওয়া হচ্ছে আলাদা অ্যাকাউন্ট।

তবে বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনায় না নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় অনেক শিশু খুব সহজেই এমন সব কনটেন্টের সামনে পড়ে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক নানা ধরনের কনটেন্ট রয়েছে। একই সঙ্গে সহিংসতা, অশালীনতা, সাইবার বুলিং, আত্মক্ষতিতে উৎসাহ, শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পরিণত নানা বিষয়ও ছড়িয়ে আছে। এসব কনটেন্ট শিশুর আচরণ, চিন্তাভাবনা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কনটেন্ট তৈরির দৌড়ে শিশুরাও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, রিলস ও শর্টস তৈরি করে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি, ভিউ বাড়ানো এবং মনিটাইজেশন নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অনেকে শুধু যোগাযোগ বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, আয়ের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছেন। এই প্রবণতার প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপরও।

অনেক ক্ষেত্রে শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনা না করেই তাকে ভিডিওর অংশ বানানো হচ্ছে। শিশুর কথা বলা, পোশাক, আচরণ, কান্না, রাগ কিংবা পারিবারিক জীবনের ব্যক্তিগত মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শক আকর্ষণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে শিশুরাই হয়ে উঠছে একটি পরিবারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টের প্রধান চরিত্র। এতে অর্থ বা জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও প্রশ্ন থেকে যায়—শিশুর সম্মতি, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশের বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

শিশু শুধু দর্শক নয়, অধিকারধারী

শিশুদের ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউনিসেফের বিভিন্ন উদ্যোগ ও নির্দেশনায় শিশুদের অনলাইন পরিবেশে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং সুস্থ বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী হলেও তাকে শুধু দর্শক কিংবা কনটেন্ট তৈরির উপকরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার নিজস্ব অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ কারণে অভিভাবকের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বয়সসীমা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। ডেনমার্কও কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে বয়স যাচাই, ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে।

কী ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের সাইবার বুলিং, বয়স-অনুপযোগী কনটেন্টের সংস্পর্শ, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

বিশেষ করে আত্মক্ষতি, শরীরের গঠন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা কিংবা অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করতে পারে—এমন কনটেন্ট শিশুদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই শুধু শিশুকে মোবাইল দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। বরং সে অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো কনটেন্ট তার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয়ও নজরে রাখা জরুরি।

ক্ষতিকর কিছু দেখলে অভিভাবক কী করবেন?

শিশু কোনো অস্বস্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখে ফেললে প্রথমেই তাকে বকাঝকা করা উচিত নয়। ভয় দেখানো বা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে শান্তভাবে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

কী দেখেছে, কোথায় দেখেছে এবং সেটি দেখে তার কেমন অনুভূতি হয়েছে—এসব জানতে হবে। এতে শিশুর মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি হবে যে অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে সে অভিভাবকের কাছে বিষয়টি বলতে পারবে।

শিশুর সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কার সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ, কোন ধরনের তথ্য প্রকাশ করা যাবে না এবং সন্দেহজনক কোনো কনটেন্ট দেখলে কী করতে হবে—এসব বয়স অনুযায়ী বুঝিয়ে দিতে হবে।

প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজন পারিবারিক নিয়ম

মোবাইল ব্যবহারের জন্য পরিবারের নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। কখন ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে, কতক্ষণ ব্যবহার করা যাবে এবং কোন জায়গায় ব্যবহার করা যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

খাবারের সময়, পড়াশোনা, ঘুমের আগে এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস শিশুর জন্য উপকারী হতে পারে।

একই সঙ্গে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, প্রাইভেসি সেটিংস, নিরাপদ সার্চ এবং বয়সভিত্তিক কনটেন্ট ফিল্টারের মতো সুবিধাগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

শিশুকে বোঝাতে হবে, নিজের পূর্ণ নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি কিংবা অন্য কোনো সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা নিরাপদ নয়।

ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট ও কনটেন্ট দেখলে ব্যবস্থা

কোনো ভিডিও, পোস্ট বা অ্যাকাউন্ট শিশুর জন্য ক্ষতিকর মনে হলে সেটি ব্লক কিংবা রিপোর্ট করার পদ্ধতিও শিশুকে শেখানো দরকার। প্রয়োজনে ‘নট ইন্টারেস্টেড’ ধরনের অপশন ব্যবহার করে অনুপযুক্ত কনটেন্ট কমিয়ে আনা যেতে পারে।

সাইবার বুলিং, হয়রানি বা সরাসরি হুমকির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট মেসেজ বা পোস্টের স্ক্রিনশটসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।

মোবাইলের বাইরে ফিরুক শৈশব

শিশুর স্ক্রিননির্ভরতা কমাতে শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সবসময় কার্যকর সমাধান নয়। বরং তার জন্য বিকল্প আনন্দ ও ব্যস্ততার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বই পড়া, খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান, প্রকৃতির কাছে সময় কাটানো কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিশুদের পুরোপুরি দূরে রাখাই সব পরিস্থিতিতে সমাধান নয়। বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানোই হতে পারে বেশি কার্যকর পথ।

শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়তো কয়েক সেকেন্ডের কাজ। কিন্তু সেই প্রযুক্তির ভালো-মন্দ বুঝিয়ে নিরাপদ ব্যবহার শেখাতে লাগে সময়, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতা।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন শিশুর নির্মল শৈশবের জায়গা দখল না করে। প্রযুক্তি হোক তাদের শেখা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের সহায়ক—শৈশব কেড়ে নেওয়ার কারণ নয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শিশুর হাতে স্মার্টফোন, নেপথ্যে কি হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব?

আপডেট সময় ০২:৫৫:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

বর্তমান সময়ে শিশুদের জীবনেও প্রযুক্তির উপস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ—বিভিন্ন কাজে অল্প বয়সেই মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে তারা। কখনো বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে, আবার কখনো শিশুর নামেই খুলে দেওয়া হচ্ছে আলাদা অ্যাকাউন্ট।

তবে বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনায় না নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় অনেক শিশু খুব সহজেই এমন সব কনটেন্টের সামনে পড়ে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক নানা ধরনের কনটেন্ট রয়েছে। একই সঙ্গে সহিংসতা, অশালীনতা, সাইবার বুলিং, আত্মক্ষতিতে উৎসাহ, শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পরিণত নানা বিষয়ও ছড়িয়ে আছে। এসব কনটেন্ট শিশুর আচরণ, চিন্তাভাবনা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কনটেন্ট তৈরির দৌড়ে শিশুরাও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, রিলস ও শর্টস তৈরি করে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি, ভিউ বাড়ানো এবং মনিটাইজেশন নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অনেকে শুধু যোগাযোগ বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, আয়ের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছেন। এই প্রবণতার প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপরও।

অনেক ক্ষেত্রে শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনা না করেই তাকে ভিডিওর অংশ বানানো হচ্ছে। শিশুর কথা বলা, পোশাক, আচরণ, কান্না, রাগ কিংবা পারিবারিক জীবনের ব্যক্তিগত মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শক আকর্ষণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে শিশুরাই হয়ে উঠছে একটি পরিবারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টের প্রধান চরিত্র। এতে অর্থ বা জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও প্রশ্ন থেকে যায়—শিশুর সম্মতি, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশের বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

শিশু শুধু দর্শক নয়, অধিকারধারী

শিশুদের ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউনিসেফের বিভিন্ন উদ্যোগ ও নির্দেশনায় শিশুদের অনলাইন পরিবেশে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং সুস্থ বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী হলেও তাকে শুধু দর্শক কিংবা কনটেন্ট তৈরির উপকরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার নিজস্ব অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ কারণে অভিভাবকের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বয়সসীমা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। ডেনমার্কও কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে বয়স যাচাই, ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে।

কী ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের সাইবার বুলিং, বয়স-অনুপযোগী কনটেন্টের সংস্পর্শ, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

বিশেষ করে আত্মক্ষতি, শরীরের গঠন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা কিংবা অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করতে পারে—এমন কনটেন্ট শিশুদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই শুধু শিশুকে মোবাইল দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। বরং সে অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো কনটেন্ট তার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয়ও নজরে রাখা জরুরি।

ক্ষতিকর কিছু দেখলে অভিভাবক কী করবেন?

শিশু কোনো অস্বস্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখে ফেললে প্রথমেই তাকে বকাঝকা করা উচিত নয়। ভয় দেখানো বা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে শান্তভাবে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

কী দেখেছে, কোথায় দেখেছে এবং সেটি দেখে তার কেমন অনুভূতি হয়েছে—এসব জানতে হবে। এতে শিশুর মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি হবে যে অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে সে অভিভাবকের কাছে বিষয়টি বলতে পারবে।

শিশুর সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কার সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ, কোন ধরনের তথ্য প্রকাশ করা যাবে না এবং সন্দেহজনক কোনো কনটেন্ট দেখলে কী করতে হবে—এসব বয়স অনুযায়ী বুঝিয়ে দিতে হবে।

প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজন পারিবারিক নিয়ম

মোবাইল ব্যবহারের জন্য পরিবারের নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। কখন ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে, কতক্ষণ ব্যবহার করা যাবে এবং কোন জায়গায় ব্যবহার করা যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

খাবারের সময়, পড়াশোনা, ঘুমের আগে এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস শিশুর জন্য উপকারী হতে পারে।

একই সঙ্গে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, প্রাইভেসি সেটিংস, নিরাপদ সার্চ এবং বয়সভিত্তিক কনটেন্ট ফিল্টারের মতো সুবিধাগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

শিশুকে বোঝাতে হবে, নিজের পূর্ণ নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি কিংবা অন্য কোনো সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা নিরাপদ নয়।

ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট ও কনটেন্ট দেখলে ব্যবস্থা

কোনো ভিডিও, পোস্ট বা অ্যাকাউন্ট শিশুর জন্য ক্ষতিকর মনে হলে সেটি ব্লক কিংবা রিপোর্ট করার পদ্ধতিও শিশুকে শেখানো দরকার। প্রয়োজনে ‘নট ইন্টারেস্টেড’ ধরনের অপশন ব্যবহার করে অনুপযুক্ত কনটেন্ট কমিয়ে আনা যেতে পারে।

সাইবার বুলিং, হয়রানি বা সরাসরি হুমকির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট মেসেজ বা পোস্টের স্ক্রিনশটসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।

মোবাইলের বাইরে ফিরুক শৈশব

শিশুর স্ক্রিননির্ভরতা কমাতে শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সবসময় কার্যকর সমাধান নয়। বরং তার জন্য বিকল্প আনন্দ ও ব্যস্ততার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বই পড়া, খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান, প্রকৃতির কাছে সময় কাটানো কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিশুদের পুরোপুরি দূরে রাখাই সব পরিস্থিতিতে সমাধান নয়। বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানোই হতে পারে বেশি কার্যকর পথ।

শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়তো কয়েক সেকেন্ডের কাজ। কিন্তু সেই প্রযুক্তির ভালো-মন্দ বুঝিয়ে নিরাপদ ব্যবহার শেখাতে লাগে সময়, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতা।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন শিশুর নির্মল শৈশবের জায়গা দখল না করে। প্রযুক্তি হোক তাদের শেখা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের সহায়ক—শৈশব কেড়ে নেওয়ার কারণ নয়।