সাইবার আইনের খসড়ায় কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব, উদ্বিগ্ন টিআইবি
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে সরকারের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুজব, অপতথ্য, মানহানি, বুলিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্টকে অপরাধের আওতায় এনে শাস্তির বিধান কঠোর করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতাও আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত এসব বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির আশঙ্কা, খসড়ার কিছু ধারা বাস্তবায়িত হলে মানুষের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তাবিত আইনটির খসড়া নিয়ে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সংশোধিত বিভিন্ন ধারা ও নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গুজব ও অপতথ্যে ১০ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব
খসড়ায় নতুন করে ২৬(ক) ধারা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই ধারায় সাইবার স্পেসে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ কিংবা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়ায় গুজবের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এমন যাচাই না করা বা অসমর্থিত তথ্য, দাবি কিংবা সংবাদকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
মানহানি যুক্ত হচ্ছে ২৫ ধারায়, বাড়ছে শাস্তি
সাইবার আইনের ২৫ ধারার শিরোনামেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং ও অশ্লীল কনটেন্টের সঙ্গে এবার মানহানিকর তথ্যকেও এ ধারার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিধানে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণ এবং যৌন হয়রানিমূলক চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভয়ভীতি সৃষ্টিকারী তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল কিংবা গ্রাফিক্স তৈরি, সংরক্ষণ, সংগ্রহ, প্রকাশ বা প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
সংশোধিত খসড়ায় এই শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী নারী কিংবা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হলে শাস্তির মাত্রা আরও বেশি রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।
বুলিংয়ের নতুন সংজ্ঞা, আইনে এআইও যুক্ত
খসড়ায় প্রথমবারের মতো বুলিংয়ের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এবং বারবার ক্ষমতা, প্রভাব বা আধিপত্যের অপব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক কিংবা ডিজিটাল উপায়ে এমন আচরণ করা হলে, যার ফলে ক্ষতি, মানসিক কষ্ট, ভয়, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্ব তৈরি হয়—তা বুলিং হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্টকেও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এআই ব্যবহার করে কোনো তথ্য, ছবি, ভিডিও বা অন্য কোনো কনটেন্ট তৈরি, সম্পাদনা কিংবা পরিবর্তন করে সেটি অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত হলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা
কোনো কোম্পানি বা আইনগত সত্তার মাধ্যমে সাইবার অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন ২৯(৩) উপধারা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত ওই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত কিংবা বাতিল করতে পারবেন। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ বা নিষিদ্ধ করার আদেশ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
‘কোম্পানি’ শব্দটির পরিধিও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। শুধু কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান নয়; বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি ব্যবসা, সমিতি, সংগঠন, ট্রাস্ট, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং অন্যান্য আইনগত সত্তাকেও এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
অনলাইন কনটেন্ট ব্লক ও অপসারণে বাড়ছে ক্ষমতা
খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে ধারা ৮(২)-এ। বর্তমান আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক তথ্য অপসারণ, ব্লক কিংবা স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে পারে।
সংশোধিত খসড়ায় এ ক্ষমতা আরও কয়েকটি সরকারি সংস্থার মধ্যে সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকেও এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ তথ্য, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর আশঙ্কা, জাতিগত বৈষম্য থেকে সহিংসতা উসকে দিতে পারে এমন কনটেন্ট, অপরাধ বা বিশৃঙ্খলার নির্দেশনা, গুজব-অপতথ্য এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানিকর তথ্য—এসব ক্ষেত্রে কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
‘অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে’—টিআইবি
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার—এই তিনটি ভিন্ন বিষয়কে একই আইনের আওতায় আনা হলেও কোনো ক্ষেত্রেই যথেষ্ট ভারসাম্য রাখা হয়নি।
তার মতে, খসড়ার বিভিন্ন বিধান এমনভাবে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে আইনের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার ঘটতে পারে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কাও রয়েছে।
টিআইবির ভাষ্য, সাইবার অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনলাইনে মানুষের মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের বিধান একই আইনে যুক্ত করা হলে তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত উত্তম চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও বিস্তৃত সরকারি ক্ষমতা ভবিষ্যতে স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

























