ঢাকা ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

নিজস্ব সংবাদ :

জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ। তার বিরুদ্ধে ওঠা জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ডব্লিউএইচও এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলমান থাকার মধ্যেই তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসের কাছে পাঠানো চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপ সামনে আসতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় সায়মা ওয়াজেদও তদন্তের আওতায় আসেন।

২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের জন্য ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করে। ২০২৫ সালের মার্চে মামলাটি করা হয়। কয়েক মাস পর জুলাইয়ে তাকে দায়িত্ব থেকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ডব্লিউএইচও তাকে অবৈতনিক প্রশাসনিক ছুটিতেও রাখে।

রয়টার্সের হাতে আসা গত ৩ জুলাইয়ের একটি চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীরা জানান, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে চীন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন সায়মা।

পদত্যাগপত্রে তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে একটি সরকারি প্লট বেআইনিভাবে পাওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল। এ বিষয়ে তার বক্তব্য, ডব্লিউএইচওতে যোগদানের অনেক আগেই তিনি ওই জমির অধিকার পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য আইনি বিধানের আওতায় জমিটি পাওয়ার বৈধ অধিকার তার ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

ডব্লিউএইচও মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রতিও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সায়মা। তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে।

চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মানুষের জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যেই তিনি আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু ডব্লিউএইচও নেতৃত্বের আচরণের কারণে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

দীর্ঘ সময় বেতন না পাওয়ার বিষয়টিও পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সায়মা। তার দাবি, প্রায় এক বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তিনি গুরুতর আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন।

এ বিষয়ে পদত্যাগের পর সায়মা ওয়াজেদ নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে অবশ্য সংস্থাটি তার প্রশাসনিক ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও সংস্থাটির মধ্যে প্রস্তুতি চলছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন আহ্বান করা হতে পারে। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৭ সালের ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি গুরুত্বপূর্ণ। মহামারি, জনস্বাস্থ্য সংকট ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই পদে থাকা ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। বাংলাদেশ, ভারতসহ এ অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর ভোটে পাঁচ বছর মেয়াদে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন।

এদিকে চীন সফর নিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জুলাইয়ে আইনজীবীদের পাঠানো চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ ব্যাখ্যা দেন, ৯০১ ডলারের একটি বিল তার এক সহকারী নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জমা দেওয়ার সময় ভুলের সৃষ্টি হয়। এটিকে কোনো ইচ্ছাকৃত আর্থিক জালিয়াতি নয়, বরং প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখানোর দাবি করেন তিনি।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে সায়মা জানান, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছিলেন। এ বিষয়টি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালকের কাছেও আগে থেকেই অবগত ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

আপডেট সময় ০২:৩৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ। তার বিরুদ্ধে ওঠা জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ডব্লিউএইচও এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলমান থাকার মধ্যেই তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসের কাছে পাঠানো চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপ সামনে আসতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় সায়মা ওয়াজেদও তদন্তের আওতায় আসেন।

২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের জন্য ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করে। ২০২৫ সালের মার্চে মামলাটি করা হয়। কয়েক মাস পর জুলাইয়ে তাকে দায়িত্ব থেকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ডব্লিউএইচও তাকে অবৈতনিক প্রশাসনিক ছুটিতেও রাখে।

রয়টার্সের হাতে আসা গত ৩ জুলাইয়ের একটি চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীরা জানান, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে চীন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন সায়মা।

পদত্যাগপত্রে তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে একটি সরকারি প্লট বেআইনিভাবে পাওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল। এ বিষয়ে তার বক্তব্য, ডব্লিউএইচওতে যোগদানের অনেক আগেই তিনি ওই জমির অধিকার পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য আইনি বিধানের আওতায় জমিটি পাওয়ার বৈধ অধিকার তার ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

ডব্লিউএইচও মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রতিও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সায়মা। তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে।

চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মানুষের জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যেই তিনি আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু ডব্লিউএইচও নেতৃত্বের আচরণের কারণে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

দীর্ঘ সময় বেতন না পাওয়ার বিষয়টিও পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সায়মা। তার দাবি, প্রায় এক বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তিনি গুরুতর আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন।

এ বিষয়ে পদত্যাগের পর সায়মা ওয়াজেদ নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে অবশ্য সংস্থাটি তার প্রশাসনিক ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও সংস্থাটির মধ্যে প্রস্তুতি চলছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন আহ্বান করা হতে পারে। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৭ সালের ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি গুরুত্বপূর্ণ। মহামারি, জনস্বাস্থ্য সংকট ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই পদে থাকা ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। বাংলাদেশ, ভারতসহ এ অঞ্চলের সদস্য দেশগুলোর ভোটে পাঁচ বছর মেয়াদে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন।

এদিকে চীন সফর নিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জুলাইয়ে আইনজীবীদের পাঠানো চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ ব্যাখ্যা দেন, ৯০১ ডলারের একটি বিল তার এক সহকারী নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জমা দেওয়ার সময় ভুলের সৃষ্টি হয়। এটিকে কোনো ইচ্ছাকৃত আর্থিক জালিয়াতি নয়, বরং প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখানোর দাবি করেন তিনি।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে সায়মা জানান, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছিলেন। এ বিষয়টি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালকের কাছেও আগে থেকেই অবগত ছিল বলে দাবি করেন তিনি।