ঢাকা ১০:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণ পুনঃতফসিলেও থামছে না খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা

নিজস্ব সংবাদ :

ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। সর্বশেষ হিসাবে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। বর্তমানে বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

খেলাপি ঋণের এমন ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও নেমে গেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে নিয়মিত ঋণের একটি অংশ ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।

বিশেষ পুনঃতফসিলেও কাটেনি সংকট

খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে গত বছর বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সুবিধার আওতায় প্রায় ৩০০ ঋণগ্রহীতা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করেন। সুবিধাটিতে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছিল।

তবে সেই সুবিধা নেওয়ার পরও অনেক ঋণগ্রহীতা আবারও সমস্যায় পড়েছেন। এমনকি আগের প্যাকেজের আওতায় থাকা কিছু গ্রাহক এখনো গ্রেস পিরিয়ড শেষ না করলেও তাদের নতুন করে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নতুন প্যাকেজে শর্ত আরও সহজ করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা গ্রাহকেরা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। একই সঙ্গে পুনর্গঠিত ঋণের মেয়াদও বাড়িয়ে চার বছর করা হয়েছে।

গ্যাস-জ্বালানি সংকটে চাপে শিল্পখাত

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগের পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার পরও শিল্প খাত নানা ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের সংকট, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

এসব কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও আয় ব্যাহত হয়েছে। ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধেও তৈরি হয়েছে চাপ। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এবার ঋণ পরিশোধের শর্ত কিছুটা সহজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শিল্প পুনরুদ্ধারে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

এদিকে সংকটে থাকা শিল্প খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা দিতে স্বল্প সুদের ঋণের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই অর্থায়নের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসা খাতে আবারও গতি ফিরবে। উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লে ঋণগ্রহীতাদের আয়ও বাড়বে। এর ফলে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চাপও কমে আসতে পারে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঋণ পুনঃতফসিলেও থামছে না খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা

আপডেট সময় ০২:৩৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। সর্বশেষ হিসাবে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। বর্তমানে বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

খেলাপি ঋণের এমন ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও নেমে গেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে নিয়মিত ঋণের একটি অংশ ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।

বিশেষ পুনঃতফসিলেও কাটেনি সংকট

খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে গত বছর বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সুবিধার আওতায় প্রায় ৩০০ ঋণগ্রহীতা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করেন। সুবিধাটিতে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছিল।

তবে সেই সুবিধা নেওয়ার পরও অনেক ঋণগ্রহীতা আবারও সমস্যায় পড়েছেন। এমনকি আগের প্যাকেজের আওতায় থাকা কিছু গ্রাহক এখনো গ্রেস পিরিয়ড শেষ না করলেও তাদের নতুন করে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নতুন প্যাকেজে শর্ত আরও সহজ করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা গ্রাহকেরা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। একই সঙ্গে পুনর্গঠিত ঋণের মেয়াদও বাড়িয়ে চার বছর করা হয়েছে।

গ্যাস-জ্বালানি সংকটে চাপে শিল্পখাত

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগের পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার পরও শিল্প খাত নানা ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের সংকট, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

এসব কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও আয় ব্যাহত হয়েছে। ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধেও তৈরি হয়েছে চাপ। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এবার ঋণ পরিশোধের শর্ত কিছুটা সহজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শিল্প পুনরুদ্ধারে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

এদিকে সংকটে থাকা শিল্প খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা দিতে স্বল্প সুদের ঋণের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই অর্থায়নের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসা খাতে আবারও গতি ফিরবে। উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লে ঋণগ্রহীতাদের আয়ও বাড়বে। এর ফলে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চাপও কমে আসতে পারে।