ঢাকা ১০:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের বাজারে মন্দা, কমেছে বাংলাদেশের রপ্তানিও

নিজস্ব সংবাদ :

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমায় চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি বিভিন্ন দেশ থেকে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে।

মাসভিত্তিক হিসাবেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে চাপের চিত্র স্পষ্ট। শুধু জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে।

তবে বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে খারাপ নয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। ভারতের রপ্তানি কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পাকিস্তানের কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

অন্যদিকে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ এ সময়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহ ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। তবে চীন ও ভারতের পতন ছিল আরও বড়—যথাক্রমে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া সরবরাহের পরিমাণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।

এদিকে পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও কমেছে অধিকাংশ প্রধান সরবরাহকারী দেশের। চীনের পোশাকের গড় মূল্য কমেছে সবচেয়ে বেশি, ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হ্রাস ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সামগ্রিক পতনের পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে চীননির্ভরতা কমাতে মার্কিন ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছেন। এর ফলে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক আমদানি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে চীনের ওপর। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামও বাজারের এই মন্দার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেনি।

তিনি মনে করেন, চীন থেকে অর্ডার স্থানান্তরের প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো তুলনামূলক ছোট সরবরাহকারীদের প্রবৃদ্ধির হার বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় অংশ এখনো শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের পোশাক কেনার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। তরুণদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবহৃত বা সেকেন্ডহ্যান্ড পোশাকের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। ফলে নতুন পোশাক আমদানির বাজারে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া ভবিষ্যৎ শুল্কনীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে মার্কিন ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমাতে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে তারা।

এ পরিস্থিতিতে চীন থেকে অর্ডার অন্য দেশে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্যও বড় সুযোগ হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করা এবং মার্কিন ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সার্বিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চলমান মন্দা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে চাপ তৈরি করলেও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন নতুন বাজার ও অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের বাজারে মন্দা, কমেছে বাংলাদেশের রপ্তানিও

আপডেট সময় ০৩:১৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমায় চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি বিভিন্ন দেশ থেকে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে।

মাসভিত্তিক হিসাবেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে চাপের চিত্র স্পষ্ট। শুধু জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে।

তবে বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে খারাপ নয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। ভারতের রপ্তানি কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পাকিস্তানের কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

অন্যদিকে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ এ সময়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহ ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। তবে চীন ও ভারতের পতন ছিল আরও বড়—যথাক্রমে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া সরবরাহের পরিমাণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।

এদিকে পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও কমেছে অধিকাংশ প্রধান সরবরাহকারী দেশের। চীনের পোশাকের গড় মূল্য কমেছে সবচেয়ে বেশি, ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হ্রাস ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সামগ্রিক পতনের পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে চীননির্ভরতা কমাতে মার্কিন ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছেন। এর ফলে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক আমদানি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে চীনের ওপর। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামও বাজারের এই মন্দার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেনি।

তিনি মনে করেন, চীন থেকে অর্ডার স্থানান্তরের প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো তুলনামূলক ছোট সরবরাহকারীদের প্রবৃদ্ধির হার বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় অংশ এখনো শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের পোশাক কেনার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। তরুণদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবহৃত বা সেকেন্ডহ্যান্ড পোশাকের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। ফলে নতুন পোশাক আমদানির বাজারে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া ভবিষ্যৎ শুল্কনীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে মার্কিন ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমাতে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে তারা।

এ পরিস্থিতিতে চীন থেকে অর্ডার অন্য দেশে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্যও বড় সুযোগ হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করা এবং মার্কিন ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সার্বিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চলমান মন্দা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে চাপ তৈরি করলেও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন নতুন বাজার ও অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।