ঢাকা ০৫:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিলসে আসক্তি: নীরবে বদলে যাচ্ছে আমাদের মন, মস্তিষ্ক ও সমাজ

নিজস্ব সংবাদ :

মনিরুজ্জামান মনির

স্মার্টফোন হাতে নিলেই একের পর এক ছোট ভিডিও। মাত্র ১৫ থেকে ৬০ সেকেন্ডের রিলস দেখতে দেখতে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, অনেকেই তা টের পান না। বিনোদনের সহজ মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পেলেও রিলসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এখন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট ভিডিওর ধারাবাহিক প্রবাহ মস্তিষ্ককে দ্রুত নতুন উদ্দীপনার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা, বই পড়া বা কোনো জটিল কাজ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। যদিও “মস্তিষ্ক পচে যায়”—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবে অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন রিলস ব্যবহার মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, ঘুম এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রিলস আসক্তির অন্যতম বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। পড়তে বসেও বারবার ফোন হাতে নেওয়া, কয়েক মিনিটের বিরতি ঘণ্টাব্যাপী স্ক্রলিংয়ে পরিণত হওয়া এবং পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা এখন অনেক পরিবারেই দেখা যাচ্ছে। কর্মজীবীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অফিসের কাজের মাঝেও বারবার রিলস দেখার কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, রিলসে অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন, সাফল্য বা বিলাসিতার ছবি দেখে অনেকের মধ্যে নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্টি, হীনমন্যতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। সামাজিক তুলনার এই প্রবণতা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমের ব্যাঘাত। রাত জেগে রিলস দেখার অভ্যাস অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

পারিবারিক সম্পর্কেও এর প্রভাব স্পষ্ট। একসঙ্গে বসেও পরিবারের সদস্যরা নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। মুখোমুখি আলাপ, পারস্পরিক যোগাযোগ ও মানসিক বন্ধন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিশুদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত স্ক্রিন নির্ভরতা ভাষা শেখা, মনোযোগ এবং সামাজিক দক্ষতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রিলস সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সচেতন ব্যবহারই হতে পারে সমাধান। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি রিলস না দেখা, পড়াশোনা বা কাজের সময় মোবাইল দূরে রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়ামে মনোযোগ দেওয়া—এসব অভ্যাস ডিজিটাল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন সেটিই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রিলস উপভোগ করা যেতে পারে, তবে সেটি যেন আসক্তিতে পরিণত না হয়—সেই সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রিলসে আসক্তি: নীরবে বদলে যাচ্ছে আমাদের মন, মস্তিষ্ক ও সমাজ

আপডেট সময় ০৭:২৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

মনিরুজ্জামান মনির

স্মার্টফোন হাতে নিলেই একের পর এক ছোট ভিডিও। মাত্র ১৫ থেকে ৬০ সেকেন্ডের রিলস দেখতে দেখতে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, অনেকেই তা টের পান না। বিনোদনের সহজ মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পেলেও রিলসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এখন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট ভিডিওর ধারাবাহিক প্রবাহ মস্তিষ্ককে দ্রুত নতুন উদ্দীপনার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা, বই পড়া বা কোনো জটিল কাজ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। যদিও “মস্তিষ্ক পচে যায়”—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবে অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন রিলস ব্যবহার মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, ঘুম এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রিলস আসক্তির অন্যতম বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। পড়তে বসেও বারবার ফোন হাতে নেওয়া, কয়েক মিনিটের বিরতি ঘণ্টাব্যাপী স্ক্রলিংয়ে পরিণত হওয়া এবং পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা এখন অনেক পরিবারেই দেখা যাচ্ছে। কর্মজীবীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অফিসের কাজের মাঝেও বারবার রিলস দেখার কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, রিলসে অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন, সাফল্য বা বিলাসিতার ছবি দেখে অনেকের মধ্যে নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্টি, হীনমন্যতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। সামাজিক তুলনার এই প্রবণতা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমের ব্যাঘাত। রাত জেগে রিলস দেখার অভ্যাস অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

পারিবারিক সম্পর্কেও এর প্রভাব স্পষ্ট। একসঙ্গে বসেও পরিবারের সদস্যরা নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। মুখোমুখি আলাপ, পারস্পরিক যোগাযোগ ও মানসিক বন্ধন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিশুদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত স্ক্রিন নির্ভরতা ভাষা শেখা, মনোযোগ এবং সামাজিক দক্ষতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রিলস সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সচেতন ব্যবহারই হতে পারে সমাধান। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি রিলস না দেখা, পড়াশোনা বা কাজের সময় মোবাইল দূরে রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়ামে মনোযোগ দেওয়া—এসব অভ্যাস ডিজিটাল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন সেটিই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রিলস উপভোগ করা যেতে পারে, তবে সেটি যেন আসক্তিতে পরিণত না হয়—সেই সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি।