প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া ও অনলাইন বেটিং দমনে নতুন আইন, সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড
দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে প্রায় ১৫৯ বছর ধরে কার্যকর থাকা ১৮৬৭ সালের The Public Gambling Act বাতিল করা হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন বেটিং পরিচালনা বা এতে জড়িত থাকার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জুয়া-সংক্রান্ত সব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকারের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এর আগে ২৩ জুন বিলটি সংসদে উপস্থাপনের পর আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছিল। কমিটির সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে চূড়ান্তভাবে আইনটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৮৬৭ সালের আইন বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় আর কার্যকর নয়। সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী জুয়া প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরেই আইনটি আধুনিকায়নের দাবি উঠে আসছিল।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনলাইন জুয়া, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক লেনদেন, ভুয়া সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি, ভিপিএন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জুয়ার বিস্তার সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব অপরাধ দমনে সমন্বিত ও আধুনিক আইনি কাঠামো প্রয়োজন ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
নতুন আইনে জুয়া-সংক্রান্ত ২৪টি পরিভাষার স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, বুকমেকার, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট এবং ভিপিএনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম।
আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মোট ১৪ ধরনের অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুয়ার আয়োজন বা পরিচালনা, অনলাইন বেটিং, জুয়ার সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহ, বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা, ম্যাচ বা স্পট ফিক্সিং, জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, রেফারেল কার্যক্রম, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, ভুয়া সিম ও ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার এবং অর্থপাচার বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন।
সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। আর অনলাইন বেটিং পরিচালনা বা এতে সম্পৃক্ত থাকলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।
জুয়ার আসর, ভবন, কক্ষ, যানবাহন, সার্ভার কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো পরিচালনা বা ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, চার লাখ টাকা জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে। জুয়ার সরঞ্জাম তৈরি, সংরক্ষণ, আমদানি, বিক্রি বা বিতরণের অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আদালত প্রয়োজন হলে এসব সরঞ্জাম ধ্বংসের নির্দেশও দিতে পারবেন।
আইনে বুকমেকার হিসেবে কাজ করার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং সেবা, ডোমেইন, ক্লাউড অবকাঠামো বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা করলেও একই মাত্রার শাস্তি দেওয়া হবে।
ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট অথবা বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সংঘবদ্ধভাবে কিংবা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে একই অপরাধ সংঘটিত হলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
নতুন আইন অনুযায়ী, ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং-সংশ্লিষ্ট অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কোনো কোম্পানি, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং সেবাদাতা বা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও আইনের আওতায় আনা যাবে। প্রয়োজনে আদালত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল কিংবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আদেশ দিতে পারবেন। একই অপরাধ পুনরাবৃত্তি হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অপরাধে ব্যবহৃত অর্থ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিমসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও আদালতকে দেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়া ও সাইবারভিত্তিক অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার করবে সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালত। তদন্ত পরিচালনা করবেন অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেট সাময়িকভাবে জব্দ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
এছাড়া জনস্বার্থে সরকার বা সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জুয়া-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ বা চ্যানেল ব্লক কিংবা নিষিদ্ধ করতে পারবে।
আইনে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ গঠন, এনআইডি, সিম ও এমএফএস সংযুক্ত যাচাই ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের আশা, নতুন এই আইন কার্যকর হলে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ডিজিটাল প্রতারণা ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে আরও শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


























