ঢাকা ১০:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০৪ বছর বয়সে কারাগারে নুর মোহাম্মদ, দুই যুগ আগের জোড়া খুন-ডাকাতির মামলায় সাজা

নিজস্ব সংবাদ :

দুই যুগেরও বেশি সময় আগে কিশোরগঞ্জের বড় বাজারে ডাকাতির সময় জোড়া হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নুর মোহাম্মদকে শেষ পর্যন্ত কারাগারে যেতে হলো। তার বয়স এখন ১০৪ বছর।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার চতুর্থ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছিলেন নুর মোহাম্মদ। তবে আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বিচারক ফারজানা ইয়াসমিনের আদালতে নুর মোহাম্মদের পক্ষে আপিলের শর্তে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী ফয়সাল আহমেদ। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আইনজীবী আদালতকে জানান, নুর মোহাম্মদের বয়স ১০৪ বছর। বয়সজনিত কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। এতকিছুর পরও তিনি স্বেচ্ছায় আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন দেওয়ার আবেদন করা হয়।

এ ছাড়া বয়স ও অসুস্থতার কারণে নিজের খরচে পরিবহনের মাধ্যমে কারাগারে যাওয়ার অনুমতিও চাওয়া হয়েছিল। তবে আদালত সেই আবেদনও মঞ্জুর করেননি।

যে ঘটনায় সাজা

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে কিশোরগঞ্জের বড় বাজার এলাকায় ফেরদৌসের দোকানে ডাকাতি হয়। ডাকাতির সময় মোশাররফ হোসেন ও আবদুল কবির নামে দুজনকে হত্যা করা হয়।

এ সময় ডাকাতেরা দোকানের সিন্দুক ভেঙে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১১০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

ঘটনার পর দোকান মালিক ফেরদৌস কিশোরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

পরবর্তীতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। মামলাটি বিচারের জন্য কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড থেকে ১০ বছরের সাজা

প্রাথমিক রায়ে নুর মোহাম্মদসহ আট আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন—হাবিবুর রহমান হাবিব, শাহ আলম, মইন উদ্দিন ওরফে মঈন উদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, আলম, দিলু ওরফে দেলোয়ার হোসেন, শুকুর আলী ও আলতু মিয়া।

অন্য পাঁচ আসামি জসিম, সিদ্দিক, আমির চান, কবির ও বজলুর রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং তা দিতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। বিচার চলাকালীন হারিছ মিয়া নামে আরেক আসামির মৃত্যু হয়।

পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি হয় উচ্চ আদালতে। ২০০৭ সালের ১৯ আগস্ট দেওয়া সিদ্ধান্তে আলমের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। তবে অন্য আসামিদের সাজায় পরিবর্তন আসে। ওই সময় নুর মোহাম্মদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড করা হয়।

রায়ের সময়ও ছিলেন আত্মগোপনে

মামলার নথিতে বলা হয়েছে, নুর মোহাম্মদ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। মামলার রায় ঘোষণার সময়ও তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

দীর্ঘ ২৩ বছরেরও বেশি সময় পর মঙ্গলবার তিনি আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেন। বয়স ১০৪ বছর এবং শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি তুলে ধরে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুই যুগ আগের মামলার ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে তাকে কারাগারে যেতে হলো।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

১০৪ বছর বয়সে কারাগারে নুর মোহাম্মদ, দুই যুগ আগের জোড়া খুন-ডাকাতির মামলায় সাজা

আপডেট সময় ০২:৪১:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুই যুগেরও বেশি সময় আগে কিশোরগঞ্জের বড় বাজারে ডাকাতির সময় জোড়া হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নুর মোহাম্মদকে শেষ পর্যন্ত কারাগারে যেতে হলো। তার বয়স এখন ১০৪ বছর।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার চতুর্থ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছিলেন নুর মোহাম্মদ। তবে আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বিচারক ফারজানা ইয়াসমিনের আদালতে নুর মোহাম্মদের পক্ষে আপিলের শর্তে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী ফয়সাল আহমেদ। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আইনজীবী আদালতকে জানান, নুর মোহাম্মদের বয়স ১০৪ বছর। বয়সজনিত কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। এতকিছুর পরও তিনি স্বেচ্ছায় আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন দেওয়ার আবেদন করা হয়।

এ ছাড়া বয়স ও অসুস্থতার কারণে নিজের খরচে পরিবহনের মাধ্যমে কারাগারে যাওয়ার অনুমতিও চাওয়া হয়েছিল। তবে আদালত সেই আবেদনও মঞ্জুর করেননি।

যে ঘটনায় সাজা

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে কিশোরগঞ্জের বড় বাজার এলাকায় ফেরদৌসের দোকানে ডাকাতি হয়। ডাকাতির সময় মোশাররফ হোসেন ও আবদুল কবির নামে দুজনকে হত্যা করা হয়।

এ সময় ডাকাতেরা দোকানের সিন্দুক ভেঙে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১১০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

ঘটনার পর দোকান মালিক ফেরদৌস কিশোরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

পরবর্তীতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। মামলাটি বিচারের জন্য কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড থেকে ১০ বছরের সাজা

প্রাথমিক রায়ে নুর মোহাম্মদসহ আট আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তারা হলেন—হাবিবুর রহমান হাবিব, শাহ আলম, মইন উদ্দিন ওরফে মঈন উদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, আলম, দিলু ওরফে দেলোয়ার হোসেন, শুকুর আলী ও আলতু মিয়া।

অন্য পাঁচ আসামি জসিম, সিদ্দিক, আমির চান, কবির ও বজলুর রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং তা দিতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। বিচার চলাকালীন হারিছ মিয়া নামে আরেক আসামির মৃত্যু হয়।

পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি হয় উচ্চ আদালতে। ২০০৭ সালের ১৯ আগস্ট দেওয়া সিদ্ধান্তে আলমের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। তবে অন্য আসামিদের সাজায় পরিবর্তন আসে। ওই সময় নুর মোহাম্মদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড করা হয়।

রায়ের সময়ও ছিলেন আত্মগোপনে

মামলার নথিতে বলা হয়েছে, নুর মোহাম্মদ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। মামলার রায় ঘোষণার সময়ও তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

দীর্ঘ ২৩ বছরেরও বেশি সময় পর মঙ্গলবার তিনি আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেন। বয়স ১০৪ বছর এবং শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি তুলে ধরে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুই যুগ আগের মামলার ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে তাকে কারাগারে যেতে হলো।