ঢাকার যানজট কমাতে ১১০ কিলোমিটার নৌপথে বৈদ্যুতিক ওয়াটার বাসের উদ্যোগ
রাজধানীর তীব্র যানজট কমানোর পাশাপাশি বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ঢাকার চারপাশের ১১০ কিলোমিটার নৌপথে বৈদ্যুতিক ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও ধলেশ্বরী নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নৌপথে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পর্যটনসেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এরই মধ্যে এ জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
গত ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিদ্যমান সার্কুলার নৌপথে দ্রুত বৈদ্যুতিক ওয়াটার বাস চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর সড়কনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান এ টি এম আবদুল বারী দানী জানান, নতুন সেবা কীভাবে কার্যকর ও শৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমানে চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বৈদ্যুতিক কিংবা সৌরবিদ্যুৎচালিত নৌযানের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ইউটিলিটি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নেবে বলেও জানান তিনি।
১১০ কিলোমিটার নৌপথে থাকছে ৪৫টি পয়েন্ট
প্রস্তাবিত সার্কুলার নৌপথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১০ কিলোমিটার। এটি ঢাকার চারপাশের পাঁচ নদী—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও ধলেশ্বরীকে একসঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই নৌপথের ৬৩ কিলোমিটার অংশে পানির গভীরতা প্রায় ১২ ফুট। বাকি ৪৭ কিলোমিটারে গভীরতা প্রায় ৮ ফুট। নৌযান চলাচল আরও নির্বিঘ্ন করতে সিরনিচটেক থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং চলছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অগভীর অংশের গভীরতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নৌপথটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী ও মীরকাদিম—এই চার নদীবন্দরকে সংযুক্ত করেছে। রয়েছে পাঁচটি টার্মিনাল ও নয়টি ল্যান্ডিং স্টেশন। সব মিলিয়ে নৌযাত্রী ওঠানামার জন্য টার্মিনাল ও ল্যান্ডিং পয়েন্ট রয়েছে ৪৫টি।
আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ
নতুন উদ্যোগের আগে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামানের মতে, আগের ওয়াটার বাস সেবার দুর্বলতাগুলো দূর না করে নতুন করে সেবা চালু করা হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
তিনি বলেন, কার্যকর ওয়াটার বাস ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নির্ভরযোগ্য ফিডার সার্ভিস, ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত নৌযান, নৌযান চলাচলের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর পানি ও পরিবেশের মান উন্নয়নের বিষয়গুলোকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
এদিকে নৌপথের বাণিজ্যিক ব্যবহারে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গাবতলী-সদরঘাট রুটে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে গণপরিবহন চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। উচ্চগতির লঞ্চ ও স্পিডবোট, যাত্রীবাহী ক্যাটামারান এবং পর্যটন নৌযান পরিচালনার বিষয়েও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
শুধু নৌযান নামালেই মিলবে না সুফল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌপথকে কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থায় রূপ দিতে হলে নদীর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। আধুনিক ল্যান্ডিং স্টেশন, পর্যাপ্ত সড়ক সংযোগ, নৌপথের নাব্যতা এবং যাত্রী নিরাপত্তার পাশাপাশি সময়নিষ্ঠ সেবাও নিশ্চিত করতে হবে।
সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, ঢাকার যানজট কমাতে অভ্যন্তরীণ নৌপথের এখনও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, নৌপরিবহন ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে আরও বেশি যুক্ত করা যেতে পারে। সরকারের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, নৌপথ সচল রাখতে সব ক্ষেত্রেই বড় প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রেজিং, নদীর বাঁক সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমেও অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
আগের ওয়াটার বাস সেবা কেন টেকেনি
ঢাকায় ওয়াটার বাস চালুর প্রথম বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট বাদামতলী-গাবতলী রুটে। পরে ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটেও চালু হয় এই সেবা। কিন্তু আর্থিক ক্ষতি ও নানা পরিচালনাগত সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত দুটি রুটই বন্ধ হয়ে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, ১২টি ওয়াটার বাস তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। এসব নৌযান থেকে আয় হয় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ফলে মোট লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কপথের তুলনায় সময়ের পার্থক্য কম থাকা, বুড়িগঙ্গার দূষণ, সদরঘাট এলাকার যানজট, ল্যান্ডিং স্টেশনের সঙ্গে দুর্বল সড়ক যোগাযোগ এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব আগের সেবাকে টেকসই হতে দেয়নি। এর পাশাপাশি বালুবাহী নৌযানের কারণে ওয়াটার বাসের চলাচল ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
নদীদূষণ নতুন উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণও ওয়াটার বাস চালুর ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা। বিআইডব্লিউটিএর সাম্প্রতিক এক জরিপে নদীতে তরল বর্জ্য ফেলার ৪২৪টি উৎস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪টি উৎস বেসরকারি কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নৌযান থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ ও সঠিকভাবে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক নৌযান চালুর পাশাপাশি নদীর পানির মান উন্নত করাও জরুরি।
এগিয়ে চলছে নৌ অবকাঠামোর কাজ
সার্কুলার নৌপথের ২০ কিলোমিটার এলাকায় ওয়াকওয়ের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আরও ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ের কাজ চলছে, যার প্রায় ৯২ শতাংশ শেষ হয়েছে। এর বাইরে আরও ১০০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
নদীর সীমানা নির্ধারণে ৭ হাজার ১০০টি সীমানা পিলার স্থাপনের লক্ষ্যের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৩২০টি পিলার বসানো হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা নদীবন্দর এলাকায় ১৭ হাজার ৮২৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ৫১৯ দশমিক ০৪ একর নদীতীরের জমি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর এলাকায় উচ্ছেদ করা হয়েছে ৬ হাজার ৯৬৩টি অবৈধ স্থাপনা এবং উদ্ধার হয়েছে ৩১৬ দশমিক ০৬ একর নদীতীরের জমি।
সব মিলিয়ে, ঢাকার নৌপথে বৈদ্যুতিক ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও এর সফলতা নির্ভর করবে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর। সড়ক ও নৌপথের মধ্যে সহজ সংযোগ, পর্যাপ্ত ল্যান্ডিং সুবিধা, নাব্যতা রক্ষা, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী নিরাপত্তা এবং সাশ্রয়ী ও সময়নিষ্ঠ সেবা নিশ্চিত করতে পারলেই ঢাকার যানজট কমাতে নৌপথ কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

























