ঢাকা ০১:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক বছরের লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার: জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় ট্রাইব্যুনালের অগ্রগতি

নিজস্ব সংবাদ :

সংগৃহীত ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তবে বিচার দ্রুত শেষ করার চেয়ে স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ‘জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার: রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষ্য, চাইলে আরও দ্রুত বিচার শেষ করা যেত, কিন্তু তাতে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রতিটি মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট প্রায় ২৬-২৭টি মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত ১০৯টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়া ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

আসামি বাছাইয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করেন এবং প্রসিকিউশন তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করে না। কোনো তদন্তে অসঙ্গতি বা ঘাটতি ধরা পড়লে সেটি পুনঃতদন্তের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, মানবাধিকার চর্চা ছাড়া একটি সভ্য রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার মতে, একটি রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পেছনে শুধু সরকার নয়, সমাজের বিভিন্ন প্রভাবশালী অংশেরও দায় রয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দায়িত্বশীল ব্যক্তি তা প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয় থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। স্বচ্ছতা বাড়াতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

গোলটেবিল আলোচনায় জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। পরে সংগঠনটির প্রোগ্রাম অফিসার সাইফুল ইসলাম জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা উপস্থাপন করেন।

আলোচনায় বক্তব্য দেন আন্দোলনে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো সাব্বির আহমেদ, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান দীপ্তি। তারা আন্দোলনের সময়কার অভিজ্ঞতা, স্বজন হারানোর বেদনা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া আইনজীবী, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, জুলাই-আগস্টের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার যেন কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা পক্ষপাতের হাতিয়ার না হয়। বরং প্রমাণনির্ভর, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

বক্তারা আরও গুরুত্বারোপ করেন—ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও আলামত সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে এইচআরএসএস মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরে। সুপারিশে নিহত ও আহতদের পরিবারকে কার্যকর ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি বন্ধে শক্তিশালী জবাবদিহিতার কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

এক বছরের লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার: জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় ট্রাইব্যুনালের অগ্রগতি

আপডেট সময় ০৩:১৬:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তবে বিচার দ্রুত শেষ করার চেয়ে স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ‘জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার: রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষ্য, চাইলে আরও দ্রুত বিচার শেষ করা যেত, কিন্তু তাতে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রতিটি মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট প্রায় ২৬-২৭টি মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত ১০৯টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়া ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

আসামি বাছাইয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করেন এবং প্রসিকিউশন তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করে না। কোনো তদন্তে অসঙ্গতি বা ঘাটতি ধরা পড়লে সেটি পুনঃতদন্তের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, মানবাধিকার চর্চা ছাড়া একটি সভ্য রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার মতে, একটি রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পেছনে শুধু সরকার নয়, সমাজের বিভিন্ন প্রভাবশালী অংশেরও দায় রয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দায়িত্বশীল ব্যক্তি তা প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয় থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। স্বচ্ছতা বাড়াতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

গোলটেবিল আলোচনায় জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। পরে সংগঠনটির প্রোগ্রাম অফিসার সাইফুল ইসলাম জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা উপস্থাপন করেন।

আলোচনায় বক্তব্য দেন আন্দোলনে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো সাব্বির আহমেদ, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান দীপ্তি। তারা আন্দোলনের সময়কার অভিজ্ঞতা, স্বজন হারানোর বেদনা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া আইনজীবী, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, জুলাই-আগস্টের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার যেন কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা পক্ষপাতের হাতিয়ার না হয়। বরং প্রমাণনির্ভর, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

বক্তারা আরও গুরুত্বারোপ করেন—ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও আলামত সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে এইচআরএসএস মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরে। সুপারিশে নিহত ও আহতদের পরিবারকে কার্যকর ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি বন্ধে শক্তিশালী জবাবদিহিতার কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।