ঢাকা ০১:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বর্জ্য নয়, পুষ্টির ভাণ্ডার: কাঁঠালের বীজ থেকে নতুন খাদ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মিলেছে পেটেন্ট

নিজস্ব সংবাদ :

বাংলাদেশে কাঁঠাল খাওয়ার পর যে বীজটি এত দিন অবহেলায় ফেলে দেওয়া হতো, সেই বীজকেই এবার উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উপাদানে রূপ দেওয়ার অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান বা ‘মিনারেল কনসেন্ট্রেট’ তৈরির এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যে সরকারি পেটেন্ট স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন যৌথভাবে দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গবেষণাটি সম্পন্ন হলেও সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ সাফল্যের তথ্য প্রকাশ করেছে।

কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?

গবেষকদের মতে, কাঁঠালের বীজে স্বাভাবিকভাবে থাকা খনিজ উপাদানকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘনীভূত করে উচ্চমাত্রার মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। শুকনা বীজে যেখানে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান থাকে, সেখানে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ৩৩ শতাংশেরও বেশি ঘনত্বে উন্নীত করা গেছে। অর্থাৎ খনিজের মাত্রা প্রায় ১৬-১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

কোন কোন খাবারে ব্যবহার করা যাবে?

এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট সহজেই বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সঙ্গে মেশানো যাবে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, আটা বা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে রুটি, বিস্কুট, কেক এবং অন্যান্য বেকারি পণ্যে এটি ব্যবহার করা সম্ভব। এতে খাবারের পুষ্টিমান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, তবে স্বাদ বা ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে না।

বছরে হাজার হাজার টন বীজ নষ্ট

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হলেও উৎপাদনের পর বিপুল পরিমাণ বীজ, খোসা ও অন্যান্য অংশ বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়। শুধু গাজীপুর জেলাতেই প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার টন কাঁঠালের বীজ অপচয় হয় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে কাঁঠালের বীজ আর বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হবে না; বরং তা উচ্চ মূল্য সংযোজিত পুষ্টিকর খাদ্য উপাদানে পরিণত হবে। এর মাধ্যমে নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি, কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এবং কৃষকের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের পেটেন্ট স্বীকৃতি

গবেষণাটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন প্রকল্প। পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর প্রযুক্তিটির পেটেন্ট প্রদান করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাইলফলক

এটি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ২১তম প্রযুক্তি এবং ‘গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নাম নিয়ে যাত্রা শুরুর পর প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে।

উপাচার্য অধ্যাপক জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষিজ বর্জ্যকে গবেষণার মাধ্যমে মূল্যবান পুষ্টিসম্পদে রূপান্তর করার এই সাফল্য দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁঠালের বীজভিত্তিক এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পুষ্টি নিরাপত্তা, খাদ্যশিল্পের উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে বীজ এত দিন রান্নাঘরের বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হতো, সেটিই এখন দেশের খাদ্য ও পুষ্টি খাতে নতুন সম্পদ হয়ে ওঠার পথে বড় এক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বর্জ্য নয়, পুষ্টির ভাণ্ডার: কাঁঠালের বীজ থেকে নতুন খাদ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মিলেছে পেটেন্ট

আপডেট সময় ০৫:০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে কাঁঠাল খাওয়ার পর যে বীজটি এত দিন অবহেলায় ফেলে দেওয়া হতো, সেই বীজকেই এবার উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উপাদানে রূপ দেওয়ার অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান বা ‘মিনারেল কনসেন্ট্রেট’ তৈরির এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যে সরকারি পেটেন্ট স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন যৌথভাবে দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গবেষণাটি সম্পন্ন হলেও সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ সাফল্যের তথ্য প্রকাশ করেছে।

কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?

গবেষকদের মতে, কাঁঠালের বীজে স্বাভাবিকভাবে থাকা খনিজ উপাদানকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘনীভূত করে উচ্চমাত্রার মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। শুকনা বীজে যেখানে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান থাকে, সেখানে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ৩৩ শতাংশেরও বেশি ঘনত্বে উন্নীত করা গেছে। অর্থাৎ খনিজের মাত্রা প্রায় ১৬-১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

কোন কোন খাবারে ব্যবহার করা যাবে?

এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট সহজেই বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সঙ্গে মেশানো যাবে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, আটা বা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে রুটি, বিস্কুট, কেক এবং অন্যান্য বেকারি পণ্যে এটি ব্যবহার করা সম্ভব। এতে খাবারের পুষ্টিমান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, তবে স্বাদ বা ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে না।

বছরে হাজার হাজার টন বীজ নষ্ট

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হলেও উৎপাদনের পর বিপুল পরিমাণ বীজ, খোসা ও অন্যান্য অংশ বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়। শুধু গাজীপুর জেলাতেই প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার টন কাঁঠালের বীজ অপচয় হয় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে কাঁঠালের বীজ আর বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হবে না; বরং তা উচ্চ মূল্য সংযোজিত পুষ্টিকর খাদ্য উপাদানে পরিণত হবে। এর মাধ্যমে নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি, কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এবং কৃষকের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের পেটেন্ট স্বীকৃতি

গবেষণাটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন প্রকল্প। পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর প্রযুক্তিটির পেটেন্ট প্রদান করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাইলফলক

এটি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ২১তম প্রযুক্তি এবং ‘গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নাম নিয়ে যাত্রা শুরুর পর প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে।

উপাচার্য অধ্যাপক জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষিজ বর্জ্যকে গবেষণার মাধ্যমে মূল্যবান পুষ্টিসম্পদে রূপান্তর করার এই সাফল্য দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁঠালের বীজভিত্তিক এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পুষ্টি নিরাপত্তা, খাদ্যশিল্পের উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে বীজ এত দিন রান্নাঘরের বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হতো, সেটিই এখন দেশের খাদ্য ও পুষ্টি খাতে নতুন সম্পদ হয়ে ওঠার পথে বড় এক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।