আগাম সবজিতে সবুজ উত্তরের মাঠ, ভালো দামের আশায় কৃষকের মুখে হাসি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
উত্তরের বিস্তীর্ণ জনপদে এখনো শীতের আমেজ পুরোপুরি শুরু হয়নি। এরই মধ্যে শীতকালীন আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। জমিতে নতুন চারা রোপণ, সেচ, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে কৃষকদের কর্মব্যস্ততা।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যেখানে আমন ধানের আবাদ ছিল, সেসব জমির অনেক জায়গাজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে শীতকালীন সবজি। মূলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউ, টমেটো, লালশাক ও ধনেপাতাসহ নানা ধরনের সবজি আবাদ করছেন কৃষকরা। আগাম বাজার ধরতে পারলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় অনেকে স্বাভাবিক সময়ের আগেই চাষ শুরু করেছেন।
ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় আগাম শিম ও বাঁধাকপি বাজারে উঠতে শুরু করেছে। উৎপাদন ভালো হওয়া এবং বাজারদর সন্তোষজনক থাকায় অনেক কৃষকের মুখে স্বস্তি দেখা গেছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সামনে সবজির উৎপাদন আরও বাড়বে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলা—রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
সবজি উৎপাদনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরের জেলাগুলোর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলের উর্বর মাটি, কৃষকদের অভিজ্ঞতা এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে এখানে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়।
মিঠাপুকুর উপজেলার রাণীপুকুর এলাকার কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তিনি আগাম সবজি চাষ করেছেন। বাঁধাকপি ও ধনেপাতা আবাদ করে এরই মধ্যে বিক্রি শুরু করেছেন। তার দাবি, গতবারের তুলনায় এবার বাঁধাকপির ফলন ভালো হয়েছে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, উৎপাদিত বাঁধাকপির একাংশ ইতোমধ্যে প্রতি মণ প্রায় ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি ধনেপাতা বিক্রি করে প্রায় ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন। সবজি উৎপাদনে যে অর্থ খরচ হয়েছে, তার তুলনায় বর্তমান বাজারদর তাকে আশাবাদী করছে।
একই এলাকার কৃষক আয়নাল মিয়া জানান, তিনি স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন সবজি আবাদ করেছেন। তার জমিতে বাঁধাকপি, শিম, মূলা, লালশাক ও ধনেপাতার চাষ রয়েছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এ বছর অনেক কৃষকের জমিতে ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতি কাটিয়ে বেশিরভাগ কৃষক আবার নতুন করে সবজি আবাদে নেমেছেন। আগাম সবজির বাজার ভালো থাকলে তাদের লোকসান অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে আগাম সবজি উৎপাদনে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ছে। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সময়ে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং উন্নত জাতের ব্যবহার বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রংপুর বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সবজি চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকি করছেন। এতে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের আয়ও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
শীত আসার আগেই উত্তরের মাঠে যে সবুজের সমারোহ তৈরি হয়েছে, তাতে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকরা। এখন তাদের বড় প্রত্যাশা—আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, রোগবালাই কম হওয়া এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া। এসব অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আগাম সবজির ভালো ফলনের পাশাপাশি কৃষকদের ঘরে ফিরতে পারে কাঙ্ক্ষিত মুনাফাও।


























