মিরপুরে তীব্র পানি সংকট: এক মাস ধরে দুর্ভোগে হাজারো পরিবার, বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের শঙ্কা
রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া ও মনিপুরসহ আশপাশের এলাকায় টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন বাসিন্দারা। চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে না পারায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক পরিবারকে বাইরে থেকে পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, আবার কেউ বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়াসার লাইনে দিনের বেশির ভাগ সময়ই পানি থাকে না। আগে গভীর রাতে কিছুটা পানি পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই সুযোগও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া এবং টয়লেট ব্যবহারের মতো প্রয়োজনীয় কাজও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বহুতল ভবনের বাসিন্দারা। একটি ভবনে শতাধিক মানুষের বসবাস থাকলেও পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সবাইকে ভাগাভাগি করে সীমিত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ সদস্য রয়েছে—এমন পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে।
পানি সংকটের প্রভাব পড়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও। অনেক মসজিদ ও মাদরাসায় প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় মুসল্লিদের অজু করতে সমস্যা হচ্ছে। বাসাবাড়িতেও একই পরিস্থিতি থাকায় সংকট আরও জটিল আকার নিয়েছে।
শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। হোটেল, সেলুনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানিয়েছেন, নিয়মিত পানি না পাওয়ায় তাদের বাড়তি খরচ করে বাইরের উৎস থেকে পানি কিনতে হচ্ছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
এদিকে পানি সরবরাহ নিয়ে ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের সঙ্গে স্থানীয় পাম্প অপারেটরদের কয়েক দফা বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু স্থানে পাইপলাইনের কারিগরি ত্রুটি এবং কয়েকটি পাম্প অচল থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে ওয়াসার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যান্ত্রিক সমস্যার কারণে মিরপুর অঞ্চলেও পানির সরবরাহ কমে গেছে। আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১২ থেকে ১৩ কোটি লিটারে নেমে এসেছে।
ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিরপুর এলাকায় প্রায় ১৮০টি গভীর নলকূপ রয়েছে, যার বেশির ভাগই দুই দশকের বেশি পুরোনো। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব নলকূপের উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় আগের মতো পানি উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না। নতুন নলকূপ স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গা খোঁজা হচ্ছে।
কাজীপাড়ার বাইশবাড়ি পাম্প এলাকায় বর্তমানে নতুন গভীর নলকূপ বসানোর কাজ চলছে। প্রায় ৮২৫ ফুট গভীরতায় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় এক হাজার ফুট পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও গভীরে যাওয়ার কথাও ভাবছে কর্তৃপক্ষ।
ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা পূরণে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ এবং বিভিন্ন নদীর পানি শোধন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে গ্রীষ্মকালে পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক পাম্প থেকে স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশেরও কম পানি পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো পাম্পে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ২০ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ঢাকাকে বড় ধরনের পানি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শহরের অধিকাংশ এলাকা কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটির নিচে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরাট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্য, কয়েক বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদী ও অন্যান্য ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে পানি সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ পর্যাপ্ত না হওয়ায় এখন এর প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে।
পানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত বিকল্প উৎসের ব্যবহার বাড়ানো না গেলে মিরপুরের বর্তমান সংকট ভবিষ্যতে রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ঢাকা আরও বড় পানি সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।


























