বেনজীরকে দেশে ফেরানো কি সময়ের ব্যাপার? দুবাইয়ের সম্মতির পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় নতুন গতি
গত ১২ই জুন দুবাইয়ের একটি শপিংমল থেকে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করে সেখানকার পুলিশ। ফাইল ছবি
দেড় মাসের বেশি সময় ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটক থাকা সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা নতুন মোড় নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইউএই সরকার নীতিগতভাবে তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।
দুদকের মুখপাত্র মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে পাঠানো রেড নোটিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলার প্রাথমিক নথি পর্যালোচনার পর দুবাই পুলিশ আবারও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এবার তারা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত আইনি ও কারিগরি তথ্য চেয়েছে।
নথি প্রস্তুত প্রায় শেষ
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, যেহেতু মামলাগুলোর তদন্ত দুদক পরিচালনা করছে, তাই প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত প্রস্তুতের কাজও তাদের তদন্ত কর্মকর্তারাই করছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফায় পাঠানোর জন্য যে নথিগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে, তার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এগুলো প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে দ্রুত দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত কীসের ওপর নির্ভর করবে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ইউএইর সরাসরি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় পুরো বিষয়টি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।
- অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ
- দুই দেশের আইনে অপরাধের সামঞ্জস্য
- আদালতে উপস্থাপিত নথির গ্রহণযোগ্যতা
- কূটনৈতিক তৎপরতার কার্যকারিতা
ইউএইতে কর্মরত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওলেরা আফরিন বলেন, আদালত মূলত এই চারটি বিষয় বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
বেনজীরের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ?
দুদক এখন পর্যন্ত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ ছয়টি মামলা করেছে। এর বাইরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
দুদক জানিয়েছে, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলার ভিত্তিতেই ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ১২ জুন দুবাইয়ের একটি শপিংমল থেকে তাকে আটক করে স্থানীয় পুলিশ।
প্রথম দফায় কী পাঠানো হয়েছিল?
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে আরবি ও ইংরেজি ভাষায় প্রস্তুত করা ১৪৪ পৃষ্ঠার একটি নথিপত্র দুবাই পুলিশের কাছে পাঠিয়েছে। এতে ছিল—
- মামলার সারসংক্ষেপ
- প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ
- আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
- তদন্তসংক্রান্ত অন্যান্য নথি
বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় আরও বিস্তারিত তথ্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
আদালতে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএই আদালত প্রথমে যাচাই করবে বাংলাদেশে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ইউএই আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না। পাশাপাশি অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, সেটিও আদালতের বিবেচনায় আসতে পারে।
বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত প্রত্যর্পণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
বিদেশি নাগরিকত্বের প্রশ্নে জটিলতা
স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ বিনিয়োগের মাধ্যমে তুরস্কের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পেয়েছেন এবং ইউএইতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে ইউএই কর্তৃপক্ষ বা বেনজীরের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গালফভিত্তিক সাংবাদিক সাইফুর রহমান মনে করেন, যদি তিনি বৈধভাবে ইউএইর আবাসিক বিনিয়োগকারী হয়ে থাকেন এবং সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ না থাকে, তাহলে তার আইনজীবীরা সেই যুক্তি আদালতে তুলে ধরতে পারেন।
তবে আইনজীবী ওলেরা আফরিনের মতে, বিনিয়োগকারী হলেই আইনি সুবিধা পাওয়া যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই; বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ এখানে বড় ভূমিকা রাখবে।
সরকারের অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও জাতিসংঘের বিভিন্ন সনদ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় আসামি হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে। অতীতে বাংলাদেশ যেমন অন্য দেশ থেকে আসামি ফিরিয়ে এনেছে, তেমনি অন্য দেশেও আসামি পাঠিয়েছে।
কত সময় লাগতে পারে?
দুদক বলছে, প্রক্রিয়াটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের ধারণা, সব আইনি ধাপ সম্পন্ন করে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
আগে দুবাই থেকে আসামি ফিরেছে
বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্থানান্তরসংক্রান্ত দুটি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় অতীতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আসামিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
২০২৩ সালে নরসিংদীর শিবপুর হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়াকে দুবাই থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। চলতি বছরের মে মাসে একই মামলার প্রধান অভিযুক্ত আরিফ সরকারকেও দেশে আনা সম্ভব হয়েছে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় নথি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ যথাযথভাবে পরিচালিত হলে বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণও পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
বেনজীর আহমেদকে ঘিরে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় এখন আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার পরীক্ষার মুখে। দুবাইয়ের নীতিগত সম্মতি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আদালতের রায়, তথ্য-প্রমাণের শক্তি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপর। ফলে এখনই নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তব আলোচনায় উঠে এসেছে।
























