বিএনপির বিজয়ে দিল্লির স্বস্তি, তবে চীনের বাড়তি প্রভাব নিয়ে সতর্ক ভারতের সংসদীয় কমিটি
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন গতি পেতে পারে—এমন মূল্যায়ন করেছে ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি। তাদের মতে, নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকে নয়াদিল্লি ইতিবাচকভাবে দেখছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি দ্রুত বাড়তে থাকায় উদ্বেগও প্রকাশ করেছে কমিটি।
বৃহস্পতিবার ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় উপস্থাপিত ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
তারেক রহমানকে মোদির দ্রুত অভিনন্দন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত অপেক্ষাকৃত সংযত ও হিসাব-নিকাশভিত্তিক নীতি অনুসরণ করে। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর দিল্লি নতুন বাস্তবতাকে দ্রুত গ্রহণ করে।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই টেলিফোনে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি মোদির শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানান।
ভারতের সংসদীয় কমিটি মনে করছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো পারস্পরিক সম্মান ও আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান
প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে ‘মানবিক বিবেচনা’ এবং ভারতের দীর্ঘদিনের আশ্রয়দানের নীতির আলোকে।
তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাকে ভারতের ভূখণ্ড রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রচলিত আইন ও আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
চীন নিয়ে দিল্লির বাড়তি উদ্বেগ
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ। কমিটি তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে—
- মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের বড় বিনিয়োগ,
- লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির উন্নয়ন, যা ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছাকাছি,
- পেকুয়ায় সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণে চীনের সহযোগিতা।
কমিটির মতে, এসব অবকাঠামো প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে ভারত সরকারকে।
গঙ্গা ও তিস্তা: আলোচনার নতুন সম্ভাবনা
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হওয়ার বিষয়টিকে ‘অগ্রাধিকারমূলক কূটনৈতিক ইস্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি।
জানা গেছে, চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গসহ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর ইচ্ছার কথা উল্লেখ করেছে ভারত।
সীমান্ত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ টহল কার্যক্রম আগের তুলনায় আরও জোরদার হয়েছে।
২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভিসা সংকট: চিকিৎসা ভিসাই এখন প্রধান ভরসা
ভারতীয় সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কার্যক্রমকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতীয় কর্মীদের প্রত্যাহারের পর ভিসা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশের পাঁচটি ভিসা কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ ভিসা দেওয়া হচ্ছে, যার বড় অংশই চিকিৎসাসংক্রান্ত।
কমিটি মনে করছে, দীর্ঘদিন সীমিত ভিসা কার্যক্রম চলতে থাকলে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
ভারতের ঋণ সহায়তা প্রকল্পে কাটছাঁট
ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাক-বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকা ১২টি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। তবে চলমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও কার্যকর হয়।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাকে ‘স্পর্শকাতর দ্বিপক্ষীয় ইস্যু’ হিসেবে উল্লেখ করেছে কমিটি।
তাদের পর্যবেক্ষণে, বিভিন্ন হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ভারত কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্যে নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করলে বর্তমানে ভোগ করা শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধার কিছু অংশ পরিবর্তিত হতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছে ভারতের সংসদীয় কমিটি।
কূটনীতির নতুন অধ্যায়, নাকি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার শুরু?
প্রতিবেদনের সামগ্রিক মূল্যায়ন বলছে, দিল্লি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে একই সঙ্গে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাবকে ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচনা করছে।
অর্থাৎ, একদিকে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা, অন্যদিকে চীন–ভারত প্রভাব প্রতিযোগিতার নতুন সমীকরণ—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই আগামী দিনের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগোবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


























