জিয়া হত্যাকাণ্ডের অজানা অধ্যায়: সার্কিট হাউস থেকে পাহাড়ের ঢাল পর্যন্ত মরদেহের রহস্য
নিজস্ব প্রতিবেদন
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তার মরদেহ কয়েক ঘণ্টার জন্য কোথায় নেওয়া হয়েছিল—এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। সে সময় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি ওই তদন্ত নথির একটি মুদ্রিত অনুলিপি প্রকাশ্যে আসায় হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।
ময়নাতদন্তে যা উঠে আসে
তদন্ত নথিতে সংযুক্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের শরীরে মোট ২০টি পৃথক গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখমণ্ডল ও নিচের চোয়ালে একাধিক গুলি লাগে, ফলে চোয়ালের হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘাড়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল।
এ ছাড়া বুকে ও পেটে প্রায় ১০টি গুলির চিহ্ন, ডান হাতে দুটি, নাভির নিচে একটি এবং দুই পায়ে আরও কয়েকটি ছোট আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্কিট হাউসে অসহায় পরিস্থিতি
হত্যাকাণ্ডের পর সকালে রাষ্ট্রপতির মরদেহ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের ৪ নম্বর কক্ষের সামনে পড়ে ছিল। প্রশাসনের অধিকাংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্থান ত্যাগ করার পর সেখানে কেবল জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) দুই কর্মকর্তা পাহারায় ছিলেন।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, স্থানীয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহে জড়িত থাকার আশঙ্কায় তারা চরম উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন এবং মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
সকাল সাড়ে ৮টার নাটকীয় ঘটনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুটি সামরিক জিপ ও একটি অস্ত্রসজ্জিত সেনা ভ্যান সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। তিনজন মেজর ও ১০ থেকে ১৫ জন সিপাহী এনএসআই কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তল্লাশি চালান। তারা ‘গোপন নথিপত্র’ সম্পর্কে জানতে চান এবং রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি স্যুটকেসে ভরে নিয়ে যান।
এনএসআই কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তারের সাক্ষ্যে বলা হয়, সেনা কর্মকর্তাদের একজনকে অন্যরা ‘মেজর মোজাফফর’ নামে সম্বোধন করছিলেন। তার নির্দেশে রাষ্ট্রপতির বিছানার সাদা চাদর এনে মরদেহটি প্রথমে ঢেকে এবং পরে মুড়িয়ে ফেলা হয়।
তিনটি মরদেহ একসঙ্গে সরিয়ে নেওয়া হয়
একই সময়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও ভ্যানে তোলা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। এরপর তিনটি মরদেহই অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আরও একদল সেনাসদস্য এসে রাষ্ট্রপতির স্যুটকেসটি নিয়ে যায়। এরপর স্থানীয় প্রশাসনের কাছে মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না।
কাপ্তাই সড়কের পাশে গোপন কবর
বিদ্রোহ দমনের পর ১ জুন সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতির মরদেহের খোঁজ শুরু করে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম তথ্য পান যে কাপ্তাই সড়কের কোথাও মরদেহটি দাফন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির এডিসি, ব্যক্তিগত সচিব, সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ ও এনএসআই সদস্যদের একটি দল রাঙ্গুনিয়ার দিকে অভিযান চালায়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কাপ্তাই সড়কের পাশে পাথরঘাটা গ্রামের একটি পাহাড়ি ঢালে কবরের সন্ধান পান।
সেখানে জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহ দাফন করা হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মরদেহগুলো উত্তোলন করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কমিশনের কঠোর পর্যবেক্ষণ
তদন্ত কমিশন বলেছে, হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম তখন কার্যত বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল; বেতার কেন্দ্র, টেলিফোন ব্যবস্থা, বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সেনা ইউনিটের দখলে থাকায় স্থানীয় কর্মকর্তাদের পক্ষে মরদেহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না।
সেনাপ্রধান কমিশনকে জানান, সকালে মরদেহ সুরক্ষার বিষয়টি তার মাথায় এলেও বিদ্রোহ দমনকে তখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। নৌবাহিনী প্রধানও বলেন, রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল এবং সে মুহূর্তে বন্দরের নিরাপত্তাই তার কাছে বেশি জরুরি মনে হয়েছিল।
মন্ত্রিসভায় আলোচনা, কিন্তু সিদ্ধান্ত নয়
তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী কমিশনকে জানান, ঢাকায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও পরে স্মরণ করতে পারেননি যে মরদেহ উদ্ধারে মন্ত্রিসভা কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল কি না।
কমিশন এই অবস্থাকে জাতীয় সংকট মুহূর্তে প্রশাসনিক সমন্বয়ের বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার নীতি’
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় স্থানীয় কর্মকর্তারা কার্যত ‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার’ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তদন্তকারীরা মনে করেন, বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি অবরুদ্ধ শহরে তাদের পক্ষে ভিন্ন কিছু করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের কাউকে মরদেহ রক্ষা করতে না পারার জন্য দায়ী করা হয়নি।
শেষ যাত্রা ঢাকায়
ময়নাতদন্ত শেষে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে জিয়াউর রহমানের মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। প্রথমে রাষ্ট্রপতি ভবনে এবং পরে জাতীয় সংসদ ভবনে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রাখা হয়। ২ জুন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে চন্দ্রিমা উদ্যানে তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের সময় তিন বাহিনীর সদস্যরা সশ্রদ্ধ অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বিউগলে ‘লাস্ট পোস্ট’ বাজানো হয় এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা আনুষ্ঠানিক সালাম জানান। হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এই রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়।

























