বোন হারানোর বেদনা পেরিয়ে হাসির আলোয় তাহসিন, প্রধানমন্ত্রীর স্নেহে নতুন স্বপ্নের ডানা
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর সমাপনী আয়োজন শেষ হওয়ার পর একটি ছবি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। হাজারো শিশুর ভিড়ে স্কুলড্রেস পরা এক কিশোরের উচ্ছ্বসিত মুখ, দুই হাত বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
ছবির সেই কিশোর তাহসিন আব্দুল্লাহ। কিন্তু তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শোকের ইতিহাস।
মাইলস্টোনের মর্মান্তিক স্মৃতি
২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ভয়াবহ ঘটনায় তাহসিন হারায় তার বড় বোন তাসনিয়াকে। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়লেও সেদিন তারা ছিল আলাদা ভবনে। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, আর তাসনিয়া অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
দুর্ঘটনার পর বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ছোট্ট তাহসিন ছুটে যায় বোনকে খুঁজতে। কেউ বলেছিল আহতদের জন্য পানি ও স্যালাইনের প্রয়োজন। দুই হাতে স্যালাইন ও পানির বোতল নিয়ে সে অপেক্ষা করেছিল তার প্রিয় আপুর জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পর থেকে বদলে যায় তাহসিনের স্বাভাবিক জীবন। এক মানসিক সহায়তা সেশনে সে লিখেছিল—
“আমার খুব কষ্ট হয়। আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বোনকে হারিয়েছি। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। আমি ওকে অনেক মিস করি।”
বোন হারানোর পর তার মুখে আগের সেই প্রাণখোলা হাসি খুব কমই দেখা যেত।
স্টেডিয়ামের সেই হাসি
গত ২৭ জুলাই আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে যেন দেখা মিলল নতুন এক তাহসিনের। প্রধানমন্ত্রী মাঠ প্রদক্ষিণ করার সময় তিনি যখন শিশুদের কাছে আসেন, তাহসিন আনন্দে হাত বাড়িয়ে দেয়। তার চোখেমুখের নির্মল উচ্ছ্বাস ক্যামেরায় ধরা পড়ে। পরে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অসংখ্য মানুষ আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান।
প্রধানমন্ত্রীর নজরে তাহসিন
পরে প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, ছবির সেই হাসিমাখা শিশুটির পেছনে রয়েছে বোন হারানোর বেদনাভরা গল্প। বিষয়টি জানার পর তিনি তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এর ধারাবাহিকতায় গতকাল বাবা নাজমুল হককে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাহসিন। বর্তমানে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারে তার আরও একটি ছোট বোন রয়েছে, যে নার্সারিতে পড়ে।
স্বপ্ন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চান।
তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়। শুধু নিজের জন্য নয়, এমন কিছু করতে চায় যা মানুষের উপকারে আসবে এবং মানুষকে আকৃষ্ট করবে।
প্রধানমন্ত্রী তার এই চিন্তাধারার প্রশংসা করেন এবং মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা, নিয়মিত খেলাধুলা ও লক্ষ্য অর্জনে অধ্যবসায়ী হওয়ার পরামর্শ দেন।
আলাপচারিতায় তাহসিন জানায়, তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা ফুটবল। প্রধানমন্ত্রী তাকে নিজের স্বাক্ষর করা একটি বাস্কেটবল ও একটি ড্রোনসেট উপহার দেন।
“একদম পরিবারের মানুষের মতো কথা বলেছেন”
সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবার দেখা করতে পেরে সে ভীষণ আনন্দিত।
তার ভাষায়—
“আমি ভাবতেই পারিনি এমন সুযোগ পাব। পুরো বিষয়টাই আমার কাছে সারপ্রাইজ ছিল।”
সে আরও জানায়, স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতা শোনানোর জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
তাহসিনের মতে, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে পরিবারের একজন সদস্যের মতোই আন্তরিকভাবে কথা বলেছেন, তাই তার একটুও নার্ভাস লাগেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখার সুযোগও পেয়েছে সে। বিশেষ করে সেখানে রাখা গাড়ি ও জাহাজের রেপ্লিকাগুলো তাকে মুগ্ধ করেছে। বাবার মোবাইল ফোন দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফিও তোলে সে।
সাক্ষাৎকালে মাইলস্টোনের দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বেদনার দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে ছোট্ট তাহসিনের মুখে ফিরে আসা এই হাসি যেন শুধু একটি ছবির গল্প নয়—এটি হারিয়ে যাওয়া আলোকে আবার খুঁজে পাওয়ার এক মানবিক অধ্যায়।


























