বাবার কাঁধ থেকে জিপিএ–৫: প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে নিরবের মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি—তার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ইয়াসার ইসলাম নিরব। পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেছেন জিপিএ–৫।
সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান নিরবের শিক্ষাজীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। বিদ্যালয়টি বাড়ি থেকে খুব কাছেই হলেও প্রতিদিন সেখানে পৌঁছানো ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলায় বাবার কোলে করে স্কুলে যেতেন তিনি। পরে বিদ্যালয় থেকে একটি হুইলচেয়ার পেলেও বাবার সহায়তা, বন্ধুদের কাঁধ এবং হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করেই চালিয়ে যেতে হয়েছে পড়াশোনা।
নিরব জানান, তিনি দীর্ঘদিন শুয়ে শুয়ে পড়াশোনা করতেন। কিন্তু পরীক্ষায় বসে লিখতে হবে জেনে বাবা তাকে অনুশীলনের জন্য উৎসাহ দেন। প্রায় দুই মাসের চেষ্টায় তিনি বসে লিখতে সক্ষম হন। ডান হাতে লিখতে না পারায় বাম হাতে, তাও স্বাভাবিক নয় এমন আঙুল দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় লিখেই তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করেছেন।
তিনি বলেন, “আমি কখনো প্রাইভেট পড়িনি। আমার শিক্ষকরা আমাকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। এই সাফল্যের পেছনে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষার সময় নিজের টেবিল ও হুইলচেয়ার নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি।”
জিপিএ–৫ পেলেও নিরবের লক্ষ্য আরও বড়। তিনি ভবিষ্যতে এইচএসসি শেষ করে মেডিকেলে ভর্তি হতে চান। বড় কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার বিশ্বাস, সুযোগ পেলে সমাজের জন্য কিছু করতে পারবেন।
নিরবের প্রধান শিক্ষক একেএম সায়ফুল ইসলাম কাজল বলেন, “নিরবের বাবা, শিক্ষক ও সহপাঠীরা তাকে ঘিরে অসাধারণ আন্তরিকতা দেখিয়েছে। তার এই ফলাফল আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য গর্বের বিষয়। আমরা বিশ্বাস করি, সে ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জন করবে।”
ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগও নিরবের সাফল্যের প্রশংসা করে বলেন, “এ ধরনের অর্জন পুরো উপজেলার জন্য অনুপ্রেরণা। নিরব যদি লিখিত আবেদন করে, সরকারি সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও আমরা সহযোগিতার চেষ্টা করব।”
একজন কৃষকের সন্তান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষা অর্জনের জন্য নিরবের নিরলস সংগ্রাম আজ অনেক তরুণের জন্য প্রেরণার গল্প। তার স্বপ্ন এখন সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে একজন চিকিৎসক হওয়া—আর সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন সমাজের সহমর্মিতা ও সহযোগিতা।


























