এসএসসিতে ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার: ইংরেজি-গণিত ও মানবিকের দুর্বলতায় বড় ধাক্কা
দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক উচ্চ পাসের হার ধরে রাখার পর টানা দ্বিতীয় বছরের মতো নিম্নমুখী হলো এসএসসির ফলাফল। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ফলাফল সার্বিক পাসের হার কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটি। এর পাশাপাশি মানবিক বিভাগের তুলনামূলক কম পাসের হারও সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ১৯ হাজার
এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থী কম জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সবার ওপরে রয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে।
ছাত্রীরা আবারও এগিয়ে
ফলাফলে এবারও ছাত্রীরা সাফল্যে এগিয়ে রয়েছে।
- ছাত্রীদের পাসের হার: প্রায় ৬৮%
- ছাত্রদের পাসের হার: প্রায় ৬০%
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের সংখ্যা বেশি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি ছাত্রী এবং প্রায় ৪৭ হাজারের বেশি ছাত্র রয়েছে।
৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য
গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন শিক্ষার্থী।
এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এবার ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। গত বছর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪৮টি। এতে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার মান, পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
ইংরেজি ও গণিতে ধসের প্রভাব
ফল বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ইংরেজি ও গণিত।
- কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে।
- ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭%, গণিতে প্রায় ৭০%।
- সিলেট বোর্ডে ইংরেজিতে প্রায় ৬৯%, গণিতে প্রায় ৭৬% শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজির ফল আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এবার সেখানে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যেখানে গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ।
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি বিষয়ই বাধ্যতামূলক হওয়ায় ইংরেজি বা গণিতে ফেল করলে শিক্ষার্থী সামগ্রিকভাবে অকৃতকার্য হয়ে যাচ্ছে, ফলে সার্বিক পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মানবিক বিভাগের ফল সবচেয়ে দুর্বল
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে।
মানবিক বিভাগ
- ছাত্রদের পাসের হার: প্রায় ৪১%
- ছাত্রীদের পাসের হার: প্রায় ৫৪%
বিজ্ঞান বিভাগ
- ছাত্রদের পাসের হার: ৭৭% এর বেশি
- ছাত্রীদের পাসের হার: প্রায় ৮৪%
ব্যবসায় শিক্ষা
বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ে কিছুটা কম হলেও মানবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ফল করেছে।
যেহেতু মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই এ বিভাগের দুর্বল ফলাফল সামগ্রিক পাসের হারকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
২০০৭ সালের পর সবচেয়ে কম পাসের হার
এসএসসির ফলাফলের গত দুই দশকের চিত্রে দেখা যায়—
- ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭%
- ২০০৮ সালে তা বেড়ে প্রায় ৭১% হয়
- পরবর্তী দীর্ঘ সময় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি ছিল
- কয়েক বছর ৯০ শতাংশেরও বেশি পাসের হার দেখা গেছে
তবে গত বছর থেকে প্রবণতায় পরিবর্তন আসে।
- ২০২৫ সালে: ৬৮.০৪%
- ২০২৬ সালে: ৬৪.০৫%
অর্থাৎ টানা দুই বছর ধরে পাসের হার কমছে এবং এবার তা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।
মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন আলোচনা
ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, এবারের ফলাফলকে তিনি খারাপ মনে করেন না। তাঁর ভাষায়, “গান মন খুলে গাওয়া যায়, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় নম্বর মন খুলে দেওয়া যায় না।”
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, উত্তরপত্র নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রকৃত প্রস্তুতির ভিত্তিতেই ফল পেয়েছে।
শুধু পাস-ফেল নয়, প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার গভীর মূল্যায়ন
শিক্ষাবিদদের মতে, এবারের ফলাফল নিয়ে আলোচনা শুধু কতজন পাস করল বা ফেল করল—এ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
তাদের মতে, প্রয়োজন—
- বিদ্যালয়ভিত্তিক শিখনঘাটতি চিহ্নিত করা
- ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার দুর্বলতা দূর করা
- মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক কর্মসূচি চালু করা
- মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমের কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনা করা
এসএসসির এবারের ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, উচ্চ পাসের হারই শিক্ষার প্রকৃত মানের একমাত্র সূচক নয়। বরং শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা দক্ষতা অর্জন করছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে.


























