ঢাকা ০১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেনে অভিবাসীর ঢল, ইউরোপে নতুন সংকটের আশঙ্কা

নিজস্ব সংবাদ :

স্পেনে একদিনে ঢুকেছে ৫০ হাজার অভিবাসন প্রত্যাশী। ছবি: সংগৃহীত

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতাতে গত ২৪ ঘণ্টায় সমুদ্র ও স্থলপথ মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মরক্কো সীমান্তঘেঁষা ছোট এই ভূখণ্ডে হঠাৎ এত বিপুল মানুষের চাপ পড়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪৯ হাজার মানুষ সেউতায় ঢুকেছেন, যেখানে পুরো অঞ্চলের জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৮৪ হাজার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শত শত মানুষ সাঁতরে উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। উপকূলে উঠতে পারার পর অনেকে ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েন। একই সময়ে স্থলসীমান্তের বিভিন্ন দুর্বল জায়গা ব্যবহার করে আরও বহু মানুষ দ্রুত সেউতায় প্রবেশ করেন।

অনুপ্রবেশের এই প্রচেষ্টার সময় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

আদালতের রায় নিয়ে নতুন বিতর্ক

সেউতার স্থলসীমান্তে প্রায় ১০ মিটার উঁচু নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং কঠোর পুলিশি নজরদারি থাকলেও সমুদ্রপথে প্রবেশের ক্ষেত্রে অভিবাসীরা সাম্প্রতিক এক আদালতের রায়ের সুবিধা পাচ্ছেন বলে আলোচনা চলছে।

স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছেন, সেউতা ও মেলিলায় সমুদ্রপথে পৌঁছানোর সময় আটক হওয়া অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। আদালতের মতে, দ্রুত সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা কেবল স্থলসীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এই রায়ের পর থেকেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পেনজুড়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

ইতালির কড়া প্রতিক্রিয়া

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সেউতার পরিস্থিতিকে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেন, নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

মেলোনি বলেন, সেউতা থেকে আসা দৃশ্যগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ইউরোপকে সীমান্ত সুরক্ষায় আরও কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন সহযোগিতা স্থগিত করার বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও স্পেনের বর্তমান অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে বলেন, অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

মাদ্রিদের পাল্টা বার্তা

ইতালির বক্তব্যের জবাবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, এ ধরনের মন্তব্য কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ ও অংশীদার দেশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। তিনি ইউরোপীয় সংহতির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সেউতা ও মেলিলা?

সেউতা ও মেলিলা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেনজেন এলাকার একমাত্র দুটি ভূখণ্ড, যেগুলোর সঙ্গে আফ্রিকার সরাসরি স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই কারণেই অঞ্চল দুটি দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ইউরোপজুড়ে বাড়ছে উত্তেজনা

স্পেনের অভিবাসন ও বৈধতা দেওয়ার নীতি নিয়ে শুধু দেশটির ভেতরেই নয়, পুরো ইউরোপে বিতর্ক বাড়ছে। ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির সভাপতি মানফ্রেড ওয়েবার অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নিয়ম কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে ফ্রান্সের ডানপন্থি নেতা জর্ডান বারদেলা অভিযোগ করেছেন, স্পেনের নাগরিকত্ব ও বৈধতা নীতি ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

নতুন ইউরোপীয় সংকটের শঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, সেউতায় হঠাৎ এত বিপুল অভিবাসী প্রবেশ শুধু স্পেনের জন্য নয়, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক দায়বদ্ধতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শেনজেন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি প্রশ্ন এখন নতুন করে ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

স্পেনে অভিবাসীর ঢল, ইউরোপে নতুন সংকটের আশঙ্কা

আপডেট সময় ০৯:৩৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতাতে গত ২৪ ঘণ্টায় সমুদ্র ও স্থলপথ মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মরক্কো সীমান্তঘেঁষা ছোট এই ভূখণ্ডে হঠাৎ এত বিপুল মানুষের চাপ পড়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪৯ হাজার মানুষ সেউতায় ঢুকেছেন, যেখানে পুরো অঞ্চলের জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৮৪ হাজার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শত শত মানুষ সাঁতরে উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। উপকূলে উঠতে পারার পর অনেকে ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েন। একই সময়ে স্থলসীমান্তের বিভিন্ন দুর্বল জায়গা ব্যবহার করে আরও বহু মানুষ দ্রুত সেউতায় প্রবেশ করেন।

অনুপ্রবেশের এই প্রচেষ্টার সময় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

আদালতের রায় নিয়ে নতুন বিতর্ক

সেউতার স্থলসীমান্তে প্রায় ১০ মিটার উঁচু নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং কঠোর পুলিশি নজরদারি থাকলেও সমুদ্রপথে প্রবেশের ক্ষেত্রে অভিবাসীরা সাম্প্রতিক এক আদালতের রায়ের সুবিধা পাচ্ছেন বলে আলোচনা চলছে।

স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছেন, সেউতা ও মেলিলায় সমুদ্রপথে পৌঁছানোর সময় আটক হওয়া অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। আদালতের মতে, দ্রুত সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা কেবল স্থলসীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এই রায়ের পর থেকেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পেনজুড়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

ইতালির কড়া প্রতিক্রিয়া

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সেউতার পরিস্থিতিকে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেন, নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

মেলোনি বলেন, সেউতা থেকে আসা দৃশ্যগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ইউরোপকে সীমান্ত সুরক্ষায় আরও কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন সহযোগিতা স্থগিত করার বিষয়ও বিবেচনায় আনা যেতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও স্পেনের বর্তমান অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে বলেন, অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

মাদ্রিদের পাল্টা বার্তা

ইতালির বক্তব্যের জবাবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, এ ধরনের মন্তব্য কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ ও অংশীদার দেশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। তিনি ইউরোপীয় সংহতির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সেউতা ও মেলিলা?

সেউতা ও মেলিলা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেনজেন এলাকার একমাত্র দুটি ভূখণ্ড, যেগুলোর সঙ্গে আফ্রিকার সরাসরি স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই কারণেই অঞ্চল দুটি দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ইউরোপজুড়ে বাড়ছে উত্তেজনা

স্পেনের অভিবাসন ও বৈধতা দেওয়ার নীতি নিয়ে শুধু দেশটির ভেতরেই নয়, পুরো ইউরোপে বিতর্ক বাড়ছে। ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির সভাপতি মানফ্রেড ওয়েবার অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নিয়ম কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে ফ্রান্সের ডানপন্থি নেতা জর্ডান বারদেলা অভিযোগ করেছেন, স্পেনের নাগরিকত্ব ও বৈধতা নীতি ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

নতুন ইউরোপীয় সংকটের শঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, সেউতায় হঠাৎ এত বিপুল অভিবাসী প্রবেশ শুধু স্পেনের জন্য নয়, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক দায়বদ্ধতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শেনজেন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ—এই তিনটি প্রশ্ন এখন নতুন করে ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।