রাজধানীতে গ্যাসের হাহাকার: বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন, রান্না ও উৎপাদনে চরম ভোগান্তি
রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে একের পর এক সিএনজি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নগরবাসীকে দিনের বড় একটি সময় রান্নার গ্যাস ছাড়া থাকতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ না থাকায় অনেক স্টেশন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। কোথাও সীমিত সরবরাহ চালু থাকলেও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
চালকদের আয় কমে যাচ্ছে
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্যাক্সিক্যাব ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে তাদের দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ধানমন্ডির এক সিএনজি চালক জানান, আগে দিনে একবার গ্যাস নিলেই সারাদিন গাড়ি চালানো যেত। এখন কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যায় না। এতে আয় আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
ট্যাক্সিক্যাব চালক মিজান বলেন, গ্যাসের অভাবে নির্ধারিত ট্রিপ বাতিল করতে হচ্ছে। যাত্রী ফিরিয়ে দিতে হওয়ায় চালক ও যাত্রী—উভয়কেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
চানখাঁরপুল এলাকার সিএনজি চালক সবুজ জানান, কয়েকটি পাম্প ঘুরেও গ্যাস পাননি। শেষ পর্যন্ত একটি স্টেশনে গিয়ে দেখেন, ‘লাইনে গ্যাস নেই’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাসাবাড়িতে রান্নার সংকট
গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতেও। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অনেক বাসায় চুলা জ্বলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিরপুরের বাসিন্দা তাসলিমা বলেন, সকালে গ্যাস থাকে না, দুপুরেও একই অবস্থা। রাতে সামান্য গ্যাস এলে তখন তড়িঘড়ি করে রান্না করতে হয়। একটি সাধারণ তরকারি রান্না করতেও অনেক বেশি সময় লাগছে।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক হিটার, ইনডাকশন চুলা অথবা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। এতে মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পখাতেও চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। কোথাও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু থাকলেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী সংকট চলতে থাকলে রপ্তানিমুখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিতাসের ব্যাখ্যা
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও সিএনজি—সব শ্রেণির গ্রাহক তীব্র স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন।
স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে আরও দুই সপ্তাহ
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশের চলমান গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।
রাজধানীতে এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে এলএনজি খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতের কাজ চলমান থাকলেও কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি কার্গো খালাস সম্ভব হচ্ছে না।
মন্ত্রী আরও জানান, এর প্রভাব শুধু রান্নার গ্যাসেই সীমাবদ্ধ নয়; গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
অনিশ্চয়তায় নগরজীবন
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, বাসাবাড়িতে অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চাপে পড়েছে। দ্রুত কারিগরি ত্রুটি মেরামত এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা.






















