ঢাকা ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারী ও শিশু নির্যাতন: কঠোর আইন থাকলেও কেন কমছে না সহিংসতা?

নিজস্ব সংবাদ :

দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আইন কঠোর হওয়া সত্ত্বেও অপরাধ দমনে প্রত্যাশিত সাফল্য মিলছে না। ফলে নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিন ক্ষেত্রেই নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিচার শেষ করে আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। যদিও উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ এখনও রয়েছে, তবু দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে দেশের অধিকাংশ মামলার বাস্তবতা এমন নয়। অনেক ঘটনায় তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, আবার কোথাও বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৪১৩টি মামলার মধ্যে মাত্র ৬৫টির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, শুধু মে মাসেই পারিবারিক সহিংসতায় বহু নারী প্রাণ হারিয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার বড় একটি অংশ ধর্ষণের ঘটনা।

ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে আইনে তদন্তের সময়সীমা কমানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সময়সীমা মানা সম্ভব হচ্ছে না। তদন্তে বিলম্ব, ফরেনসিক পরীক্ষার জটিলতা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে, সেসব মামলায় প্রশাসনিক তৎপরতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কিন্তু আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য ভুক্তভোগীর মামলা দীর্ঘদিন অগ্রগতি ছাড়াই পড়ে থাকে। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কঠোর শাস্তি নয়, অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং তদন্তের গতি বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পরিবারে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিশুদের জন্য বয়স উপযোগী জীবনদক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ ও যৌন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা চালু এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, পারিবারিক পর্যায়ে সম্মানজনক আচরণের চর্চা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে সহিংসতাবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

যে কোনো ধরনের সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য সরকারের জাতীয় সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯ এবং শিশুদের জন্য চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ বিনামূল্যে সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের যৌথ দায়িত্ব। আইন দ্রুত প্রয়োগ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামাজিক মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সহিংসতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নারী ও শিশু নির্যাতন: কঠোর আইন থাকলেও কেন কমছে না সহিংসতা?

আপডেট সময় ১২:০৮:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আইন কঠোর হওয়া সত্ত্বেও অপরাধ দমনে প্রত্যাশিত সাফল্য মিলছে না। ফলে নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিন ক্ষেত্রেই নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিচার শেষ করে আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। যদিও উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ এখনও রয়েছে, তবু দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে দেশের অধিকাংশ মামলার বাস্তবতা এমন নয়। অনেক ঘটনায় তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, আবার কোথাও বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৪১৩টি মামলার মধ্যে মাত্র ৬৫টির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, শুধু মে মাসেই পারিবারিক সহিংসতায় বহু নারী প্রাণ হারিয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার বড় একটি অংশ ধর্ষণের ঘটনা।

ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে আইনে তদন্তের সময়সীমা কমানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সময়সীমা মানা সম্ভব হচ্ছে না। তদন্তে বিলম্ব, ফরেনসিক পরীক্ষার জটিলতা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে, সেসব মামলায় প্রশাসনিক তৎপরতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কিন্তু আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য ভুক্তভোগীর মামলা দীর্ঘদিন অগ্রগতি ছাড়াই পড়ে থাকে। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কঠোর শাস্তি নয়, অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং তদন্তের গতি বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পরিবারে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিশুদের জন্য বয়স উপযোগী জীবনদক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ ও যৌন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা চালু এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, পারিবারিক পর্যায়ে সম্মানজনক আচরণের চর্চা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে সহিংসতাবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

যে কোনো ধরনের সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য সরকারের জাতীয় সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯ এবং শিশুদের জন্য চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ বিনামূল্যে সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের যৌথ দায়িত্ব। আইন দ্রুত প্রয়োগ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামাজিক মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সহিংসতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।