ঢাকা ০২:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম: যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতাল থেকে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত

নিজস্ব সংবাদ :

বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহস, মানবিকতা ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম। অস্ত্র হাতে নয়, চিকিৎসাসেবাকে যুদ্ধের শক্তিতে পরিণত করে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন রক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে সিলেট অঞ্চলের বালাট এলাকায় কয়েকদিন আটকা পড়ে থাকতে হয়। স্থানীয় থানায় নাম নিবন্ধনের পর কয়েকদিন অপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধাদের বহনকারী একটি ট্রাকে করে যাত্রা অব্যাহত রাখেন। শিলঙ হয়ে আসানসোল বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁর সঙ্গে থাকা পিস্তল নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তবে ভারতীয় এক ব্রিগেডিয়ারের দেওয়া পরিচয়পত্র দেখানোর পর পরিস্থিতির সমাধান হয় এবং অস্ত্রটি বৈমানিকের কাছে জমা রেখে তিনি আগরতলায় পৌঁছাতে সক্ষম হন।

আগরতলায় পৌঁছে তাঁর সাক্ষাৎ হয় ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে। তিনি বিশ্রামগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত আহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। এরপর ডা. সিতারা বেগম সেখানে চিকিৎসাসেবায় যোগ দেন এবং দ্রুতই হাসপাতালটির অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিশ্রামগঞ্জের বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালটি ধীরে ধীরে প্রায় ৪০০ শয্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মুবিনসহ আরও অনেক চিকিৎসক কাজ করলেও হাসপাতালের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘ সময় তাঁর ওপরই ছিল। যুদ্ধ চলাকালে তিনি বহুবার আগরতলা গিয়ে ওষুধ, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও অনুদান সংগ্রহ করে হাসপাতালে নিয়ে আসতেন।

একদিন হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী তাঁকে করমর্দন করে বলেন, “হ্যালো, ক্যাপ্টেন সিতারা।” তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি সবার কাছে “ক্যাপ্টেন সিতারা” নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরেননি। হাসপাতালে তখনও বহু আহত মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের ফেলে না রেখে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যান। পরে রোগীদের কুমিল্লায় আনা হয় এবং সাময়িকভাবে কুমিল্লা কলেজের ছাত্রীনিবাসে রাখা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁদের ঢাকার ইস্কাটনে স্থানান্তর করা হয়।

এ সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের লাখনৌ পাঠানোর একটি পরিকল্পনা নেওয়া হলে ডা. সিতারা বেগম এর বিরোধিতা করেন। তিনি রোগীদের ইচ্ছা ও বাস্তব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তি তুলে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে সক্ষম হন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিশ্রামগঞ্জের বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের দায়িত্বশীলদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র সেনাবাহিনী থেকে আগত কর্মকর্তা। স্বাধীনতার পর তিনি পুনরায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা ডা. আবিদুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাঁর বড় ভাই মেজর এ টি এম হায়দার বীরউত্তম ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর হায়দারের মৃত্যুর পর ডা. সিতারা বেগম যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

যুদ্ধের ইতিহাসে ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম শুধু একজন চিকিৎসক নন; তিনি ছিলেন মানবিক সাহস, দায়িত্ববোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক অনন্য প্রতীক। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে তাঁর নিরলস সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: ডয়েচে ভেলে ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যভান্ডার

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম: যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতাল থেকে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত

আপডেট সময় ০৩:২০:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহস, মানবিকতা ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম। অস্ত্র হাতে নয়, চিকিৎসাসেবাকে যুদ্ধের শক্তিতে পরিণত করে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন রক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে সিলেট অঞ্চলের বালাট এলাকায় কয়েকদিন আটকা পড়ে থাকতে হয়। স্থানীয় থানায় নাম নিবন্ধনের পর কয়েকদিন অপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধাদের বহনকারী একটি ট্রাকে করে যাত্রা অব্যাহত রাখেন। শিলঙ হয়ে আসানসোল বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁর সঙ্গে থাকা পিস্তল নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তবে ভারতীয় এক ব্রিগেডিয়ারের দেওয়া পরিচয়পত্র দেখানোর পর পরিস্থিতির সমাধান হয় এবং অস্ত্রটি বৈমানিকের কাছে জমা রেখে তিনি আগরতলায় পৌঁছাতে সক্ষম হন।

আগরতলায় পৌঁছে তাঁর সাক্ষাৎ হয় ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে। তিনি বিশ্রামগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত আহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। এরপর ডা. সিতারা বেগম সেখানে চিকিৎসাসেবায় যোগ দেন এবং দ্রুতই হাসপাতালটির অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিশ্রামগঞ্জের বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালটি ধীরে ধীরে প্রায় ৪০০ শয্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মুবিনসহ আরও অনেক চিকিৎসক কাজ করলেও হাসপাতালের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘ সময় তাঁর ওপরই ছিল। যুদ্ধ চলাকালে তিনি বহুবার আগরতলা গিয়ে ওষুধ, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও অনুদান সংগ্রহ করে হাসপাতালে নিয়ে আসতেন।

একদিন হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী তাঁকে করমর্দন করে বলেন, “হ্যালো, ক্যাপ্টেন সিতারা।” তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি সবার কাছে “ক্যাপ্টেন সিতারা” নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফেরেননি। হাসপাতালে তখনও বহু আহত মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের ফেলে না রেখে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যান। পরে রোগীদের কুমিল্লায় আনা হয় এবং সাময়িকভাবে কুমিল্লা কলেজের ছাত্রীনিবাসে রাখা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁদের ঢাকার ইস্কাটনে স্থানান্তর করা হয়।

এ সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের লাখনৌ পাঠানোর একটি পরিকল্পনা নেওয়া হলে ডা. সিতারা বেগম এর বিরোধিতা করেন। তিনি রোগীদের ইচ্ছা ও বাস্তব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তি তুলে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে সক্ষম হন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিশ্রামগঞ্জের বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের দায়িত্বশীলদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র সেনাবাহিনী থেকে আগত কর্মকর্তা। স্বাধীনতার পর তিনি পুনরায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা ডা. আবিদুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাঁর বড় ভাই মেজর এ টি এম হায়দার বীরউত্তম ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর হায়দারের মৃত্যুর পর ডা. সিতারা বেগম যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

যুদ্ধের ইতিহাসে ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম শুধু একজন চিকিৎসক নন; তিনি ছিলেন মানবিক সাহস, দায়িত্ববোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক অনন্য প্রতীক। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে তাঁর নিরলস সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: ডয়েচে ভেলে ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যভান্ডার