তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতের উদ্বেগ, কী বলছে দেশটির গণমাধ্যম?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে তা ভারতের কৌশলগত স্বার্থে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা নদী উন্নয়ন প্রকল্প, সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার পথে এগোচ্ছে, যা ভারতের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু জানিয়েছে, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য সংবেদনশীল বিষয়। কারণ প্রকল্পটি শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি এলাকায় বাস্তবায়িত হতে পারে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থল যোগাযোগপথ। দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকায় বাংলাদেশ এখন নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিকল্প সহযোগীর দিকে ঝুঁকছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ও চীন সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই জমি আগে ভারতের জন্য নির্ধারিত থাকলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। পত্রিকাটির মতে, বঙ্গোপসাগর এলাকায় চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হলে তা ভবিষ্যতে কৌশলগত গুরুত্বও পেতে পারে।
ইন্ডিয়া টুডে প্রশ্ন তুলেছে, বিষয়টি ভারতের জন্য কতটা উদ্বেগের। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি শুধু একটি বিনিয়োগ প্রকল্প নয়; বরং ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির সম্ভাবনাও তৈরি করছে। যদিও সরাসরি সামরিক ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই, তবুও অতীতে বিভিন্ন বন্দরে চীনের বিনিয়োগকে নিরাপত্তা ও নজরদারির সঙ্গে যুক্ত করার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
দ্য প্রিন্টও তিস্তা প্রকল্পকে ভারতের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, শিলিগুড়ি করিডোরের নিকটবর্তী এলাকায় চীনের যেকোনো কার্যক্রম ভারতের জন্য বাড়তি সতর্কতার কারণ হতে পারে।
এদিকে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চীনের তৈরি ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে নিয়মিত ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়। যদিও এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা আসেনি, তবুও ভারতীয় বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থনের আশ্বাস দেন এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই বক্তব্যকে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখেছে, যদিও কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু মূলত অর্থনৈতিক নয়; বরং নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। মোংলা বন্দর, তিস্তা অববাহিকা এবং সম্ভাব্য অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাংলাদেশ এখন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। একদিকে চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বের সঙ্গে বজায় রাখতে আগ্রহী।
সব মিলিয়ে, ভারতীয় গণমাধ্যম তারেক রহমানের চীন সফরকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন হলেও, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও ঢাকার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।























