অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান: বিক্রমপুরের বিশ্ববরেণ্য মনীষী
বাংলার ইতিহাসে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও ধর্মসংস্কারক। তাঁর অসাধারণ জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি শুধু বাংলা বা ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, সমগ্র এশিয়ায় বিশেষভাবে সমাদৃত। তিনি বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যা আজও তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে আছে।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী অঞ্চলে এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের নাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। পিতা কল্যাণশ্রী ছিলেন একজন রাজা এবং মাতা প্রভাবতী ছিলেন একজন ধর্মপরায়ণ ও শিক্ষানুরাগী নারী। ছোটবেলা থেকেই তিনি অসাধারণ মেধা, জ্ঞানপিপাসা এবং ধর্মচর্চার প্রতি গভীর আগ্রহ প্রদর্শন করেন।
যৌবনে তিনি রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে জ্ঞানার্জন ও ধর্মসাধনার পথে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরীসহ সে সময়ের বিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যয়ন করেন। দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, চিকিৎসাশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বলা হয়, তিনি শতাধিক শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছিলেন।
জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি সুদূর সুমাত্রা (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার অংশ) ভ্রমণ করেন এবং সেখানে প্রায় ১২ বছর অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে তিনি দ্রুত একজন শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর প্রজ্ঞা ও শিক্ষার কারণে তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারের প্রধান আচার্যের মর্যাদা লাভ করেন, যা সে সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ শিক্ষাগত পদ ছিল।
একাদশ শতাব্দীতে তিব্বতের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তিব্বতের রাজা ও ধর্মগুরুরা অতীশ দীপঙ্করকে সেখানে আমন্ত্রণ জানান। তিনি দীর্ঘ ও দুর্গম পথ অতিক্রম করে তিব্বতে পৌঁছান এবং সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টা তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটায় এবং তাঁকে তিব্বতের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
অতীশ দীপঙ্কর বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত “বোধিপথপ্রদীপ” গ্রন্থটি বৌদ্ধ দর্শনের একটি অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর শিক্ষা মানুষকে সত্য, করুণা, সহনশীলতা ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান ও মানবসেবাই মানুষের প্রকৃত উন্নতির পথ।
১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের নেথাং অঞ্চলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর আদর্শ, দর্শন ও শিক্ষা আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুসৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও তিব্বতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান শুধু একজন ধর্মগুরু নন, তিনি ছিলেন জ্ঞান, মানবতা ও শান্তির দূত। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের শিক্ষা দেয় যে অধ্যবসায়, জ্ঞানচর্চা এবং মানবকল্যাণের মাধ্যমে একজন মানুষ বিশ্বসভ্যতায় অমর হয়ে থাকতে পারেন। বিক্রমপুরের এই কৃতী সন্তান আজও বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।























