হবিগঞ্জে আটকে এনসিপি: চার ঘণ্টা সড়কে অবস্থান, অভিযোগ দিয়ে ফিরলেন নাহিদ-সারজিসরা
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: টানা চার ঘণ্টার বেশি সময় সড়কে অপেক্ষা করেও পুলিশের বাধার কারণে হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করতে পারেননি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতারা। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে তারা রাতে মৌলভীবাজারে ফিরে যান।
বুধবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ সড়কের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। এনসিপির দাবি, হবিগঞ্জে ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে পুলিশ একাধিক স্থানে তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। তবে পুলিশের ভাষ্য, পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা থাকায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হামলার প্রতিবাদ ঘিরে নতুন উত্তেজনা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘জুলাই পদযাত্রা-২০২৬’ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে এনসিপির নেতাদের বহরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে সারজিস আলমসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে দলটির অভিযোগ। সাংবাদিকদের কয়েকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার হবিগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় এনসিপি। একই সময়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের পৃথক কর্মসূচির ঘোষণা আসায় শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসন সকাল থেকেই হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
শ্রীমঙ্গলে প্রথম বাধা
বিকাল ৪টার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য মাহমুদা মিতুসহ শীর্ষ নেতারা মৌলভীবাজার সার্কিট হাউস থেকে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রীমঙ্গলের চা-কন্যা ভাস্কর্য এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের বহর থামিয়ে দেয়। সেখানে পুলিশ ও নেতাকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টা পর বহরটি আবার যাত্রা শুরু করে।
কামাইছড়ায় চূড়ান্ত আটকে দেওয়া
শ্রীমঙ্গলের বাধা পেরিয়ে বহরটি হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া ও মিরপুর এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ সড়কের ওপর আড়াআড়িভাবে ট্রাক রেখে পুনরায় পথরোধ করে। এ সময় নেতারা গাড়ি থেকে নেমে সড়কের ওপর অবস্থান নেন।
নাহিদ ইসলাম পুলিশের উদ্দেশে বলেন, “আমরা হবিগঞ্জে গিয়ে মামলা করবো, আমাদের কেন আটকে রাখা হচ্ছে?”
সারজিস আলম অভিযোগ করেন, বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে তাদের বহর আটকে রাখা হয়েছে এবং পরে শুধু থানায় গিয়ে মামলা করার অনুমতি চাইলেও বাধা দেওয়া হয়েছে।
থানায় যেতে না পেরে তদন্ত কেন্দ্রে অভিযোগ
রাত ৮টার দিকে এনসিপি নেতারা কামাইছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে অবস্থান নেন এবং মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তানভীর রুয়েল বাদী হয়ে দায়ের করা অভিযোগে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমদ রিংগনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও প্রায় ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারেক মাহমুদ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, “এনসিপি ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এনসিপি নেতারা শহরে প্রবেশ করে সমাবেশ করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা ছিল। তাদের নিরাপত্তা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কামাইছড়ায় অবস্থান নেয়।”
তিনি আরও জানান, তদন্ত শেষে অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাতেই মৌলভীবাজারে প্রত্যাবর্তন
লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে এনসিপির নেতারা হবিগঞ্জ সীমান্ত এলাকা ত্যাগ করে মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। তারা রাতে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন।
মৌলভীবাজার জেলা এনসিপির আহ্বায়ক খালেদ হাসান জানান, বৃহস্পতিবার সকালে নেতারা সিলেটের উদ্দেশে রওনা হবেন এবং সেখানে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিক্রিয়া
এদিকে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলা এবং বুধবারের কর্মসূচিতে পুলিশি বাধার নিন্দা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জোটটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ এক বিবৃতিতে বলেন, “রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা ও হামলার ঘটনা গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী।”
হবিগঞ্জে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক অবস্থান, ১৪৪ ধারা জারি, পুলিশের কঠোর অবস্থান এবং হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত রয়েছে। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এনসিপির নতুন কর্মসূচি পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।

























