রুফিয়া থেকে টাকা পাঠাতেই বিপুল ক্ষতি, মালদ্বীপপ্রবাসীদের দুর্ভোগের কথা সংসদে তুললেন হাসনাত
মালদ্বীপে কর্মরত প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী দেশে অর্থ পাঠাতে গিয়ে মুদ্রা রূপান্তর ও বৈধ রেমিট্যান্স ব্যবস্থার জটিলতার কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মালদ্বীপপ্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, মালদ্বীপের স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া থেকে বাংলাদেশি টাকায় সরাসরি বৈধভাবে অর্থ পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রবাসীদের একাধিক ধাপে মুদ্রা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে উপার্জনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হারাচ্ছেন তারা।
হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালদ্বীপে অধিকাংশ বাংলাদেশি কর্মী রুফিয়ায় বেতন পান। কিন্তু সেই অর্থ বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সরাসরি রুফিয়া-টাকা লেনদেনের সুযোগ সীমিত। ফলে অনেককে প্রথমে রুফিয়া দিয়ে মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে হয়।
তিনি বলেন, সরকারি বিনিময় হার অনুযায়ী এক মার্কিন ডলারের মূল্য প্রায় ১৫ দশমিক ৪৬ রুফিয়া। তবে ডলারের সংকটের কারণে বাস্তবে খোলা বাজারে একটি ডলার কিনতে ২১ থেকে ২২ রুফিয়া পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। এতে শুধু মুদ্রা রূপান্তরের পর্যায়েই প্রবাসীদের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
এরপর বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে। ফলে মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষতির পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপেও অর্থনৈতিক লোকসান হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো প্রবাসী মাসে ৫ হাজার রুফিয়া দেশে পাঠালে বিদ্যমান ব্যবস্থায় তাঁর প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। এক বছরের হিসাবে এই লোকসানের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে।
বৈধ চ্যানেল না থাকায় বাড়ছে হুন্ডির ঝুঁকি
সংসদ সদস্যের মতে, রুফিয়া থেকে বাংলাদেশি টাকায় সরাসরি রেমিট্যান্স পাঠানোর কার্যকর সুযোগ না থাকায় প্রবাসীদের একটি অংশ হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ব্যক্তিগতভাবে প্রবাসীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
কারণ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসে না। ফলে সরকার ঘোষিত রেমিট্যান্স প্রণোদনা থেকে প্রবাসীরা যেমন বঞ্চিত হন, তেমনি এসব অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও যুক্ত হয় না।
হাসনাত আবদুল্লাহ দাবি করেন, মালদ্বীপে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকরাও অতীতে একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পরে দেশটির হাইকমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিষয়টির সমাধান করা সম্ভব হয়েছিল।
সমাধানে চার প্রস্তাব হাসনাতের
মালদ্বীপপ্রবাসীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকারের কাছে চারটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তিনি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. রুফিয়া থেকে সরাসরি বাংলাদেশি টাকায় রেমিট্যান্স পাঠানোর বৈধ ও সহজ ব্যবস্থা চালু করা।
২. মালদ্বীপে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা, এক্সচেঞ্জ হাউস অথবা এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া।
৩. অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ ও বৈধ রেমিট্যান্স করিডোর গড়ে তোলা।
৪. মুদ্রা রূপান্তরের ক্ষেত্রে কনভার্শন ফি ও সরকারি প্রণোদনার বিষয়গুলো স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য করা।
পোস্টে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর বক্তব্য, এজেন্সি ও সিন্ডিকেটকেন্দ্রিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত না থেকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে মন্ত্রণালয়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা এবং একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের উদ্যোগের মাধ্যমেই রেমিট্যান্স পাঠানোর এই জটিলতা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছেন তিনি। নিজের ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যের ঘরে প্রবাসীদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার আহ্বান জানান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
























