যে ফুল একদিন হতো বর্জ্য, আজ সেই পাপড়িতেই গড়ছে নারীদের স্বাবলম্বিতার নতুন ইতিহাস
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী—দেশের ফুলচাষের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বহু বছর ধরেই পরিচিত। বছরের প্রায় প্রতিটি সময়ই এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠ রঙিন হয়ে থাকে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, গাঁদাসহ নানা জাতের ফুলে। বিশেষ দিবসগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে ফুলের চাহিদা তৈরি হয়, তার বড় একটি অংশই আসে এই অঞ্চল থেকে।
তবে ফুলের এই রাজ্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ছিল এক কঠিন বাস্তবতা। মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদন, বাজারে দাম কমে যাওয়া কিংবা নানা কারণে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফুল বিক্রি না হয়েই নষ্ট হয়ে যেত। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে সেই ফুল গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করতেন বা ফেলে দিতেন। এতে বছরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ফুলের অপচয় হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এই সমস্যাকেই সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় গদখালীর পানিসারা গ্রামের তিন নারী—রাবেয়া খাতুন, নাসরিন নাহার আশা ও সাজেদা বেগমকে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের একটি হর্টিকালচার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। দেশে ফিরে তারা শুধু নিজেরাই কাজ শুরু করেননি, স্থানীয় নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি দক্ষ কর্মীদল।
প্রথমে ২৭ জন নারী এই উদ্যোগে যুক্ত হলেও বর্তমানে প্রায় ৬০ জন নিয়মিতভাবে ফুলের পাপড়ি ও অব্যবহৃত অংশ দিয়ে পরিবেশবান্ধব নানা পণ্য তৈরি করছেন। তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে সুগন্ধি সাবান, হারবাল ফেসপ্যাক, নারিকেল তেল, ব্যথানাশক তেল, আগরবাতি, প্রাকৃতিক রং, গোলাপজল, সুগন্ধি তেল, এমনকি ফুলের শুকনো পাপড়ি দিয়ে তৈরি অলংকার, ওয়ালম্যাট, চাবির রিং, ফটোফ্রেম ও কলম।
গোলাপের শুকনো পাপড়ি ব্যবহার হচ্ছে প্রসাধনী তৈরিতে, আর গাঁদা ও গোলাপের নির্যাস থেকে তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক রং, যা কাপড়ে নকশার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে যেসব ফুলের কোনো মূল্য ছিল না, এখন সেগুলোই হয়ে উঠছে নতুন আয়ের উৎস।
উদ্যোক্তা সাজেদা বেগম জানান, স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি গদখালীতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরাও এসব অর্গানিক পণ্য কিনে নিয়ে যান। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে এখনো উৎপাদন সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। একটি আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করা গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এসব পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা তাদের।
নাসরিন নাহার আশা বলেন, সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই কাজ তাদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী করেছে। নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করে আয় বাড়ার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। ফুলের সৌন্দর্য এখন শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে তাদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে।
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও অর্গানিক পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যথাযথ প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে গদখালীর এই উদ্যোগ দেশের ফুলশিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
একসময় যে ফুল বিক্রি না হয়ে নষ্ট হতো, আজ সেই ফুলই নারীদের হাতে রূপ নিচ্ছে মূল্যবান পণ্যে। অপচয়ের গল্প পেছনে ফেলে গদখালী এখন লিখছে সম্ভাবনা, উদ্ভাবন আর স্বাবলম্বিতার নতুন এক সফলতার গল্প।


























