যশোর সীমান্তে ধরা পড়ল চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন, উদ্ধার আধার কার্ড
চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আলোচিত নাম ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেনকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে ভারতের একটি আধার কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।
সীমান্ত পেরোনোর আগেই অভিযান
পুলিশ সুপার জানান, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর খবর পেয়ে ডেভিড ইমন দেশত্যাগের পরিকল্পনা করেন। বুধবার ভোরে ঝিকরগাছা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের কথা ছিল তার। তবে তার আগেই যশোরের কোতোয়ালি উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারে তাকে গ্রহণ করার জন্যও একটি পক্ষ প্রস্তুত ছিল। আটক অভিযানে যশোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল, কোতোয়ালি থানা পুলিশ এবং চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন।
ভুয়া পরিচয়ে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমন নিজের পরিচয় গোপন করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আগে থেকেই তার পালানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য ছিল। সীমান্ত ব্যবহার করে পালাতে তাকে সহায়তা করার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অস্ত্র উদ্ধারের পর নতুন মামলা
গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনকে নিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ফটিকছড়ি থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই মামলায় তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার অপরাধ নেটওয়ার্ক ও সহযোগীদের বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য মেলেনি
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এখন পর্যন্ত ডেভিড ইমন বা তার সহযোগীদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক গডফাদারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সাময়িক শিথিলতার সুযোগে তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারত থেকে দেশে এসে আবার পালানোর চেষ্টা?
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানান, ডেভিড ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় থাকায় তাকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। পুনরায় ভারতে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডেভিড ইমন পুলিশকে জানিয়েছেন, তার কাছে দেশি ও বিদেশি—দুটি পাসপোর্ট রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করতেন।
দুবাইভিত্তিক সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
পুলিশের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থানরত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী তিনি। দুবাই থেকে নির্দেশনা নিয়ে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, অস্ত্র ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক গুরুতর মামলার আসামি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অন্তত পাঁচটি থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রায় ১৫টি মামলা রয়েছে। গত দেড় বছরে সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত জোড়া হত্যা, হামলা, ভাঙচুর ও প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায়ও তার নাম উঠে এসেছে।
সবশেষ গত ১১ জুলাই নগরের চকবাজার অ্যাক্সেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। দাবি পূরণ না হওয়ায় তার অনুসারীরা ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ বলছে, ডেভিড ইমনকে ঘিরে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং তার সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।























