ঢাকা ০১:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস, বিরোধী দলের ওয়াকআউট

স্টাফ রিপোর্টার:

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস

মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিতে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তির মধ্যেই তিনটি বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও বিলগুলো পাস হলো। সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় মানবাধিকার, গণভোট ও গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের আইনগত কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য নয়—এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা তদন্তের অগ্রগতি জানার, ঘটনার সত্য উদঘাটনের এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার পাবেন।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ব্যয় বহন করবে।

গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা তাদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের ঘটনাগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার—উভয়ই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে।

তবে গুমের ঘটনা তদন্তে কোনও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের বিধান রাখা হয়নি। তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই থাকছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন।

নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে।

কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

বিলে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের (অপশনাল প্রটোকল) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যাশনাল প্রিভেনটিভ মেকানিজম ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই ইউনিট নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।

আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিলটি পর্যালোচনা করে কমিশনে চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনার রাখার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিককে নিয়োগ-সুপারিশকারী সার্চ কমিটিতে রাখার সুপারিশ করা হয়। ওই সাংবাদিককে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনোনীত করবেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস, বিরোধী দলের ওয়াকআউট

আপডেট সময় ০৭:৩১:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিতে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তির মধ্যেই তিনটি বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও বিলগুলো পাস হলো। সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় মানবাধিকার, গণভোট ও গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের আইনগত কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য নয়—এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা তদন্তের অগ্রগতি জানার, ঘটনার সত্য উদঘাটনের এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার পাবেন।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ব্যয় বহন করবে।

গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা তাদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের ঘটনাগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার—উভয়ই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে।

তবে গুমের ঘটনা তদন্তে কোনও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের বিধান রাখা হয়নি। তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই থাকছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন।

নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে।

কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

বিলে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের (অপশনাল প্রটোকল) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যাশনাল প্রিভেনটিভ মেকানিজম ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই ইউনিট নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।

আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিলটি পর্যালোচনা করে কমিশনে চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনার রাখার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিককে নিয়োগ-সুপারিশকারী সার্চ কমিটিতে রাখার সুপারিশ করা হয়। ওই সাংবাদিককে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনোনীত করবেন।