ঢাকা ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিরোধী জোট ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের পথে সরকার, বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ

নিজস্ব সংবাদ :

বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন জোট। এ লক্ষ্যে গঠিত ১২ সদস্যের সংসদীয় বিশেষ কমিটি মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) প্রথম বৈঠকে বসছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, উদ্বোধনী বৈঠকে সদস্যদের পরিচিতি পর্বের পাশাপাশি কমিটির কর্মপরিধি, কার্যপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। সংবিধানের সম্ভাব্য সংশোধনী নিয়ে কার্যকর ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা মূলত পরবর্তী বৈঠকগুলো থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে গত ১৩ জুলাই এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব হলো সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে সুপারিশ প্রস্তুত করে সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

বিরোধী জোটের অনুপস্থিতি

সরকারি দল সংসদের বিরোধী জোটকে কমিটিতে পাঁচজন সদস্য মনোনয়নের আহ্বান জানালেও তারা কোনো নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই বিরোধী সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন এবং কমিটির বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি তোলেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ছিল, তাদের আপত্তি শুধু সদস্য মনোনয়ন নিয়ে নয়; বরং তারা সংবিধানের আংশিক সংশোধনের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক সংস্কার চান। তার মতে, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নতুন সংসদীয় কমিটি গঠন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

সরকারের অবস্থান

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদে জানান, বিরোধী দলের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলেও তারা সদস্য দিতে সম্মত হয়নি। সে কারণে পাঁচটি আসন আপাতত শূন্য রেখে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিরোধী দল চাইলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই সংবিধানের ভিত্তিতেই সংসদ গঠিত হয়েছে। ফলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি আরও দাবি করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নেওয়া শপথের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে গৃহীত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলেও প্রথমে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সেই আলোচনার জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটিকেই উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে সরকার।

কারা আছেন কমিটিতে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও কমিটিতে রয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহ।

পটভূমিতে জুলাই জাতীয় সনদ

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। সনদে সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে রাষ্ট্র কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বেশ কিছু মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবও রয়েছে।

এসব প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও বিএনপির ভিন্নমত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে দলটি অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের মিত্ররা জুলাই সনদের আলোকে পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বিএনপি ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি।

সামনে কী?

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষ কমিটি বিচারপতি, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করবে। এসব আলোচনা শেষে সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিরোধী জোটের অনুপস্থিতিতে শুরু হতে যাওয়া এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কতটা বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে এবং বিরোধী দলগুলো শেষ পর্যন্ত আলোচনায় যোগ দেয় কি না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বিরোধী জোট ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের পথে সরকার, বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ

আপডেট সময় ০২:৩১:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন জোট। এ লক্ষ্যে গঠিত ১২ সদস্যের সংসদীয় বিশেষ কমিটি মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) প্রথম বৈঠকে বসছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, উদ্বোধনী বৈঠকে সদস্যদের পরিচিতি পর্বের পাশাপাশি কমিটির কর্মপরিধি, কার্যপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। সংবিধানের সম্ভাব্য সংশোধনী নিয়ে কার্যকর ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা মূলত পরবর্তী বৈঠকগুলো থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে গত ১৩ জুলাই এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব হলো সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে সুপারিশ প্রস্তুত করে সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

বিরোধী জোটের অনুপস্থিতি

সরকারি দল সংসদের বিরোধী জোটকে কমিটিতে পাঁচজন সদস্য মনোনয়নের আহ্বান জানালেও তারা কোনো নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই বিরোধী সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন এবং কমিটির বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি তোলেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ছিল, তাদের আপত্তি শুধু সদস্য মনোনয়ন নিয়ে নয়; বরং তারা সংবিধানের আংশিক সংশোধনের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক সংস্কার চান। তার মতে, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নতুন সংসদীয় কমিটি গঠন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

সরকারের অবস্থান

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদে জানান, বিরোধী দলের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলেও তারা সদস্য দিতে সম্মত হয়নি। সে কারণে পাঁচটি আসন আপাতত শূন্য রেখে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিরোধী দল চাইলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই সংবিধানের ভিত্তিতেই সংসদ গঠিত হয়েছে। ফলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি আরও দাবি করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নেওয়া শপথের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে গৃহীত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলেও প্রথমে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সেই আলোচনার জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটিকেই উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে সরকার।

কারা আছেন কমিটিতে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও কমিটিতে রয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহ।

পটভূমিতে জুলাই জাতীয় সনদ

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। সনদে সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে রাষ্ট্র কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বেশ কিছু মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবও রয়েছে।

এসব প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও বিএনপির ভিন্নমত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে দলটি অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের মিত্ররা জুলাই সনদের আলোকে পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বিএনপি ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি।

সামনে কী?

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষ কমিটি বিচারপতি, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করবে। এসব আলোচনা শেষে সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিরোধী জোটের অনুপস্থিতিতে শুরু হতে যাওয়া এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কতটা বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে এবং বিরোধী দলগুলো শেষ পর্যন্ত আলোচনায় যোগ দেয় কি না।