প্রশাসনের শীর্ষ দুই পদে বড় পরিবর্তনের আভাস, নতুন মুখ আসছে?
নিজস্ব প্রতিবেদক
জনপ্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ—মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব—নিয়ে প্রশাসনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহসানুল হকের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আগামী ১৬ আগস্ট শেষ হতে যাচ্ছে। মেয়াদ নবায়ন হবে নাকি নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়েই প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে জল্পনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবার নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল জ্যেষ্ঠতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনিক দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, সততা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের যোগ্যতা এবং সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই আসবে বলে জানা গেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পদ
মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় এবং নীতিনির্ধারণী কাজের অগ্রগতি তদারকিতে এই পদটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন ও জনবল ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব পালন করে। ফলে এই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব প্রশাসনের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন।
আলোচনায় যেসব নাম
মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার-এর নাম প্রশাসনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কারণে তাকে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ-এর নামও আলোচনায় রয়েছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, যদি আবদুস সাত্তার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পদে আখতার আহমেদকে বিবেচনা করা হতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে আলোচনায় আছেন এএসএম সালেহ আহমেদ। অতীতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জেলা প্রশাসকসহ মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তার অভিজ্ঞতা এই পদে বিবেচিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
এ ছাড়া শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী-র নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় ঘুরছে। তবে সরকারিভাবে এখনো কোনো নাম চূড়ান্ত হয়নি।
পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলি, পদায়ন ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে সমন্বয় জোরদার, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রথাগতভাবে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সচিবদের মধ্য থেকেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ দেওয়া হলেও অতীতে প্রয়োজন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারও সরকার উভয় বিকল্প খোলা রেখেছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
নাসিমুল গণির মেয়াদ নিয়ে মিশ্র আলোচনা
বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণিকে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে অনেকেই ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করলেও সাম্প্রতিক কিছু পদোন্নতি ও নিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, অবসরপ্রাপ্ত বা শৃঙ্খলাজনিত বিতর্কে থাকা কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার যোগ্য অনেক কর্মকর্তা উপেক্ষিত হয়েছেন। যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেনি।
বঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গও আলোচনায়
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করা অনেক কর্মকর্তাকে নিয়েও প্রশাসনে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে এমন ১১৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন তাদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের দাবি উঠছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।
সরকারের নীতির ইঙ্গিত
প্রশাসনের শীর্ষ দুই পদে আসন্ন সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান দুই কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সরকারের ভবিষ্যৎ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২২ জন সিনিয়র সচিব, সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এই নিয়োগকে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের বড় সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের মত
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক মনে করেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মরত না চুক্তিভিত্তিক—এটি মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়।
তার ভাষায়, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যোগ্য, অভিজ্ঞ, সৎ এবং কার্যকরভাবে প্রশাসন পরিচালনার সক্ষমতা রাখেন কি না।”
প্রশাসনের ভেতরে এখন তাই একটাই প্রশ্ন—শীর্ষ দুই পদে অভিজ্ঞদের মেয়াদ বাড়বে, নাকি সরকারের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আসবে নতুন নেতৃত্ব? আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।

























