নীতিমালা তৈরিকে ‘গবেষণা’ দেখিয়ে বিটিআরসিতে লাখ লাখ টাকার সম্মানী, উঠেছে প্রশ্ন
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশের টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন ও এ–সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। তবে সেই দায়িত্ব পালনের একটি কাজকে ‘গবেষণা’ হিসেবে দেখিয়ে কমিশনের কর্মকর্তাদের জন্য বিপুল অঙ্কের সম্মানী বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের নতুন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি প্রণয়নের কাজকে গবেষণা প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে এতে যুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য প্রায় ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা সম্মানী অনুমোদন করা হয়েছে। সম্প্রতি কমিশনের বৈঠকে এই অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নীতিমালার বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত গাইডলাইন তৈরিতে যুক্তদের জন্য আরও ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে যাচাই–বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর বিটিআরসি ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুই প্রতিনিধি ছাড়া বাকি সদস্যরা ছিলেন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা। তাদের দায়িত্ব ছিল নতুন নীতিমালার খসড়া ও সরকারের জন্য একটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করা।
প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর কমিটিটি পুরো কার্যক্রমকে গবেষণা হিসেবে উল্লেখ করে একটি পৃথক প্রস্তাব দেয়। এরপর গবেষণার নামে প্রায় ২৯ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়। যদিও অনেকের প্রশ্ন, নীতিমালা তৈরির মতো দায়িত্ব কমিশনের নিয়মিত কাজের মধ্যেই পড়ে কি না এবং এটি আদৌ গবেষণার সংজ্ঞায় পড়ে কিনা।
নথিতে দেখা যায়, এই প্রকল্পে তিন ধাপে সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষক দলের মূল সম্মানী, সভা ভাতা, কর্মশালার সম্মানী এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ—সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে একজন কমিশনারের জন্য মোট ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গবেষক হিসেবে মূল সম্মানী, ১৩টি সভার ভাতা, দুটি কর্মশালার আটটি অধিবেশনের সম্মানী এবং বিশেষ দায়িত্বের জন্য পৃথক অর্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া নীতিমালা নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত ১৩ জন বাইরের বিশেষজ্ঞের প্রত্যেককে তিনটি সভায় অংশ নেওয়ার বিপরীতে সম্মানী প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে নীতিমালা বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত আরেকটি কমিটিতে থাকা ২৮ কর্মকর্তার জন্যও গবেষক হিসেবে সম্মানী দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জানা গেছে, অতীতে আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবা (আইএলডিটিএস) নীতিমালা প্রণয়নের সময় বিটিআরসির কর্মকর্তা ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করলেও সে সময় নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবেই কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল এবং অতিরিক্ত সম্মানী দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, এটি কমিশনের দৈনন্দিন দায়িত্বের কাজ নয়; বরং একটি কৌশলগত উদ্যোগ। তাঁর ভাষ্য, শুধু বিটিআরসির কর্মকর্তাই নন, শিল্পখাত, একাডেমিয়া এবং বিভিন্ন অংশীজনকে যুক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে নীতিমালাটি তৈরি করা হয়েছে এবং সব ধরনের সম্মানী সরকারি বিধিমালা অনুসারেই প্রদান করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নীতিমালা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত কয়েকজন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরো কার্যক্রমকে গবেষণা বলা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে। তাঁর দাবি, অনেক বিষয়ে বিটিআরসি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছিল, আর বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা ছিল মূলত মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একই কাজের জন্য গবেষক পরিচয়ে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণ এবং সভার সংখ্যা অনুযায়ী আলাদা সম্মানী নেওয়ার সংস্কৃতি অযৌক্তিক ও অনৈতিক। তাঁর মতে, এ ধরনের চর্চা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং ভবিষ্যতে এমন সুযোগ বন্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।

























