ঢাকা ০৪:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিআইবির জরিপে ভয়াবহ চিত্র: এক বছরে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা

নিজস্ব সংবাদ :

দেশের সেবা খাতজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও ঘুষের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র এক বছরে বিভিন্ন সরকারি ও জনসেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে Transparency International Bangladesh (TIB)।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফল প্রকাশ করে সংস্থাটি। জরিপে উঠে এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ঘুষ যেন সেবা পাওয়ার অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে এবং দুর্নীতি ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নমুনাকাঠামো অনুসরণ করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চলের ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতের দুর্নীতির চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট সেবা (৭৬.৬ শতাংশ) এবং বিআরটিএ-সংক্রান্ত সেবা (৬৩.৫ শতাংশ) দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে। এর পরেই রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি প্রশাসন এবং বিচারিক সেবা খাত। এসব ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের শুধু ঘুষই নয়, নানা ধরনের হয়রানি ও অনিয়মেরও শিকার হতে হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ জনগণের বড় একটি অংশের কাছে রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক খাতে উচ্চমাত্রার দুর্নীতি নাগরিকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট এবং বিআরটিএ খাতে দুর্নীতির প্রবণতা কমার পরিবর্তে স্থায়ী বা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন সেবাগ্রহীতারা।

দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরও ৬১.৩ শতাংশ পরিবার কোনো ধরনের অভিযোগ করেনি। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে—পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রায় অর্ধেক পরিবারই জানে না কোথায় এবং কীভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে হয়।

জরিপে দেখা গেছে, Anti-Corruption Commission (দুদক) সম্পর্কে ২৯.৫ শতাংশ মানুষের ধারণা থাকলেও সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে জানে মাত্র ১.৪ শতাংশ পরিবার। অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির পরিবর্তে নানা সুবিধা পাওয়ার প্রবণতাই দুর্নীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।

জরিপে আরও উঠে এসেছে বৈষম্যমূলক বাস্তবতা। গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে শহরাঞ্চলে এ হার ৫৮.৫ শতাংশ। তবে অর্থের পরিমাণের দিক থেকে শহরের পরিবারগুলোকে তুলনামূলক বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।

এ ছাড়া নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বৈষম্য, হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিআইবির মতে, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করা হলেও তা এখনো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই সেবাগ্রহীতাদের দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার আড়ালেও ঘুষ ও দুর্নীতির চক্র সক্রিয় থেকে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে, দুর্নীতি এখন বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি দেশের সেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে, যা নাগরিক অধিকার, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্রমাগত ক্ষয় করছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

টিআইবির জরিপে ভয়াবহ চিত্র: এক বছরে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা

আপডেট সময় ০৯:০৫:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

দেশের সেবা খাতজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও ঘুষের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র এক বছরে বিভিন্ন সরকারি ও জনসেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে Transparency International Bangladesh (TIB)।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফল প্রকাশ করে সংস্থাটি। জরিপে উঠে এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ঘুষ যেন সেবা পাওয়ার অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে এবং দুর্নীতি ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নমুনাকাঠামো অনুসরণ করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চলের ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতের দুর্নীতির চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট সেবা (৭৬.৬ শতাংশ) এবং বিআরটিএ-সংক্রান্ত সেবা (৬৩.৫ শতাংশ) দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে। এর পরেই রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি প্রশাসন এবং বিচারিক সেবা খাত। এসব ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের শুধু ঘুষই নয়, নানা ধরনের হয়রানি ও অনিয়মেরও শিকার হতে হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ জনগণের বড় একটি অংশের কাছে রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক খাতে উচ্চমাত্রার দুর্নীতি নাগরিকদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট এবং বিআরটিএ খাতে দুর্নীতির প্রবণতা কমার পরিবর্তে স্থায়ী বা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন সেবাগ্রহীতারা।

দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরও ৬১.৩ শতাংশ পরিবার কোনো ধরনের অভিযোগ করেনি। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে—পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রায় অর্ধেক পরিবারই জানে না কোথায় এবং কীভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে হয়।

জরিপে দেখা গেছে, Anti-Corruption Commission (দুদক) সম্পর্কে ২৯.৫ শতাংশ মানুষের ধারণা থাকলেও সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে জানে মাত্র ১.৪ শতাংশ পরিবার। অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির পরিবর্তে নানা সুবিধা পাওয়ার প্রবণতাই দুর্নীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।

জরিপে আরও উঠে এসেছে বৈষম্যমূলক বাস্তবতা। গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে শহরাঞ্চলে এ হার ৫৮.৫ শতাংশ। তবে অর্থের পরিমাণের দিক থেকে শহরের পরিবারগুলোকে তুলনামূলক বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।

এ ছাড়া নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বৈষম্য, হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিআইবির মতে, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করা হলেও তা এখনো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই সেবাগ্রহীতাদের দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার আড়ালেও ঘুষ ও দুর্নীতির চক্র সক্রিয় থেকে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে, দুর্নীতি এখন বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি দেশের সেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে, যা নাগরিক অধিকার, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্রমাগত ক্ষয় করছে।