চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত দিন: মহেশখালী থেকে হাটহাজারী, উন্নয়ন-সহায়তা-সাংগঠনিক বৈঠকে গুরুত্ব চার খাতে
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। রোববার (৯ আগস্ট) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই সফরে কক্সবাজারের মহেশখালী, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। দিনের শেষভাগে নগরের একটি পাঁচতারকা হোটেলে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন তিনি।
সফরকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে প্রশাসনিক ও দলীয় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা, যাতায়াত, অনুষ্ঠানস্থল ও হেলিপ্যাড ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ সম্পন্ন করেছে।
মহেশখালীতে শুরু, নজরে বড় উন্নয়ন প্রকল্প
দিনের প্রথম কর্মসূচিতে সকাল ৯টার দিকে মহেশখালী পৌঁছানোর কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা)-এর চলমান কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন তিনি।
প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করবেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ীকে ঘিরে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা এই সফরে গুরুত্ব পেতে পারে।
বাঁশখালীতে বন্যাদুর্গত ১০০ পরিবারের হাতে নতুন ঘর
মহেশখালী থেকে প্রধানমন্ত্রী যাবেন বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এলাকায়। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের জন্য নির্মিত নতুন ঘর হস্তান্তর কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন তিনি।
বন্যায় দরিদ্র ও জেলে সম্প্রদায়ের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ে। সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিজস্ব অর্থে ঘর নির্মাণে অক্ষম পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের জন্য বাছাই করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রতীকীভাবে একজন স্বজনহারা নারীর হাতে ঘরের চাবি তুলে দেবেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
হাটহাজারীতে পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তা
সফরসূচিতে হাটহাজারীতেও রয়েছে বন্যাদুর্গতদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি। সেখানে ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথাও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সহায়তা কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফটিকছড়িতে আলেমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ
বাঁশখালীর কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় যাবেন। সেখানে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
সাক্ষাতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় ৫০ জন নেতা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গেছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে এটিকে অরাজনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় উন্নয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
স্থানীয় নেতারা সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, কয়েকটি কলেজ সরকারিকরণ, গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণ, চা ও রাবার বাগানে গ্যাস-সংযোগ এবং শিল্পাঞ্চল স্থাপনের মতো দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দুই আলেমের কবর জিয়ারত
ফটিকছড়ির কর্মসূচি শেষে সড়কপথে হাটহাজারীতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং প্রয়াত আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করার কথা রয়েছে।
এই অংশটিকে সফরের ধর্মীয় ও সৌজন্যমূলক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাতে বিএনপির সাংগঠনিক বৈঠক
দিনের শেষ কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম নগরের একটি পাঁচতারকা হোটেলে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের পাশাপাশি ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ নেতাকর্মী সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন। চট্টগ্রামের সাংগঠনিক অবস্থা, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, কমিটি পুনর্গঠন এবং তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে উত্তর জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা, দক্ষিণ জেলার উপজেলা ও পৌরসভা কমিটিগুলোর কার্যক্রম এবং মহানগরের ওয়ার্ড পর্যায়ের সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে দিকনির্দেশনা আসতে পারে বলে স্থানীয় নেতারা আশা করছেন।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে সফরসূচিতে থাকা বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ, অনুষ্ঠানস্থল, হেলিপ্যাড ও আশপাশের এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সফরের প্রতিটি ধাপে সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
চার দিকেই গুরুত্ব
সব মিলিয়ে এবারের চট্টগ্রাম সফরে চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে—বড় উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, আলেমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং বিএনপির তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের এই প্রথম চট্টগ্রাম সফর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

























