এইচএসসি আন্দোলনের নেপথ্যে কারা? গোয়েন্দাদের নজরে দেশ-বিদেশি সংযোগ, ভাইরাল সূহিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক
শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশের পরও থামেনি বিতর্ক; আন্দোলনে উসকানি, গুজব ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে মাঠে গোয়েন্দারা, ভাইরাল পরিচয় দেওয়া তরুণীর বিরুদ্ধে জিডি।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে ঘিরে নতুন করে তদন্তে নেমেছে দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ এবং সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা সত্ত্বেও আন্দোলনের আড়ালে কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ সক্রিয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের কিছু ব্যক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্দোলনের সময় অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার উৎস শনাক্তে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিট।
গোয়েন্দাদের নজরে আন্দোলনের সামনের সারির কয়েকজন
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা কয়েকজনের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পটভূমিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ধারণ করা ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি ও উসকানিমূলক আচরণে জড়িত ছিলেন। তাদের পরিচয় ও সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ চলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অতীতের মতো এবারও কিছু গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে সরকারকে বিব্রত করা এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করেছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, আন্দোলনে দৃশ্যমান অনেকেই প্রকৃত পরীক্ষার্থী নন বলেও তথ্য মিলেছে। তবে সারাদেশের তুলনায় আন্দোলনের পরিসর সীমিত ছিল বলে সরকার এটিকে বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখছে না।
ভাইরাল সূহিকে ঘিরে নতুন মোড়
আন্দোলনের সময় “১২ কোটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়েছি” বক্তব্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসা রুবাইয়া মেহজাবিন সূহিকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ জানিয়েছে, তিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী নন। শৃঙ্খলাজনিত কারণে আগেই তাকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কলেজের পরিচয় ব্যবহার করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার তুরাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে মাইলস্টোন কলেজ। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের নতুন দাবি
রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থী আগের দাবির পাশাপাশি নতুন দুটি দাবি উত্থাপন করেন।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সৃজনশীল (CQ) ও বহুনির্বাচনী (MCQ) অংশে আলাদা পাসের নিয়ম বাতিল করে মোট নম্বরের ভিত্তিতে ফল মূল্যায়ন।
- অনিবার্য কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বা বিকল্প পরীক্ষার ব্যবস্থা।
এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নপত্রে ভুল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং হিসাববিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নের মান নিয়েও আপত্তি তোলেন তারা।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, তারা অটোপাস চান না; বরং শিক্ষার্থীবান্ধব, ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন ব্যবস্থা চান। একই সঙ্গে তারা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন।
ডিএমপির অবস্থান
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনো অপশক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল আন্দোলন
টানা ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেককে হাঁটুপানি পেরিয়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর একটি ব্যক্তিগত ফোনালাপের অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা একটি মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এরপরই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।
সায়েন্সল্যাব, উত্তরা, বাড্ডা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনেও অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। পরবর্তীতে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আন্দোলন আরও আলোচনায় আসে।
এদিকে আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, এর পেছনে সম্ভাব্য উসকানিদাতা এবং অনলাইনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।























