আরেকটি গণআন্দোলনের ইঙ্গিত শফিকুর রহমানের, সরকার ও বিএনপির কঠোর সমালোচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক গণসমাবেশে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীকে নতুন এক গণআন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছে। একই সঙ্গে বিএনপিকেও তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন।
বুধবার সকালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি গণআন্দোলন। তার ভাষায়, সেই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি ছিল দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।
শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাই আন্দোলনের কোনো একক মাস্টারমাইন্ড নেই। নির্যাতিত জনগণই ছিল সেই আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি।” তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচনপূর্ব যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন এখন আর দেখা যাচ্ছে না এবং গণভোটের রায় কার্যকর না করা হলে তা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল হবে।
শহিদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসনের দাবি
সমাবেশে তিনি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের “জাতির সম্পদ” হিসেবে উল্লেখ করে তাদের নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা না করার আহ্বান জানান। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী আন্দোলনকারীদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং শহিদ পরিবারগুলোর সম্মানজনক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবিও তোলেন।
তিনি জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের দাবি উপেক্ষা করে কার সঙ্গে সমঝোতা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
‘দেশে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে’
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তার মতে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে, যা নতুন এক অনিবার্য গণআন্দোলনের ইঙ্গিত বহন করছে।
সমাবেশে অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বলেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজন সৃষ্টি না করে ঐক্যের পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজনের ভূমিকা নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জনগণের প্রধান দাবি এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। তা উপেক্ষা করা হলে সরকার দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানান।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, দেশে কোথাও অন্যায়-জুলুম হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং নতুন করে কোনো স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখা দিলে তা শুরুতেই প্রতিহত করা প্রয়োজন।
হাসপাতালে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে গিয়ে নতুন অভিযোগ
পরে রাজধানীর কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইসলামী ছাত্রশিবিরের আহত নেতাকর্মীদের দেখতে যান ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে হেলমেট ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল, বর্তমানে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে ছাত্রদলের কিছু কর্মী সহিংসতা চালাচ্ছে।
এ সময় জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। দলটির পক্ষ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক
ডা. শফিকুর রহমানের “আরেকটি বিপ্লব সন্নিকটে” মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সরকার ও বিএনপিকে একসঙ্গে লক্ষ্য করে দেওয়া তার এই বক্তব্যকে অনেকেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, এমন বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিরোধী রাজনীতির গতিপথে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

























