ঢাকা ০৪:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আম কাঁঠালের ছুটি’র পর নতুন চমক, নদী-বন্দরের জীবন নিয়ে নূরুজ্জামানের ‘মাস্তুল’

নিজস্ব সংবাদ :

তিন বছর আগে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ নির্মাণ করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী নির্মাতা হিসেবে আলোচনায় আসেন মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। এবার তিনি দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহের নতুন চলচ্চিত্র ‘মাস্তুল’ নিয়ে। শুক্রবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় নদী, বন্দর এবং ভাসমান মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে আবেগঘন এক গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

‘মাস্তুল’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি তেলবাহী জাহাজের বৃদ্ধ পাচক এবং বন্দর এলাকায় বসবাসকারী এক পথশিশুকে ঘিরে। তাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একাকীত্ব, মমতা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানবিকতার নানা দিক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা।

শীতলক্ষ্যার তীর থেকে গল্পের জন্ম

নির্মাতা জানান, ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র পর তিনি অন্য একটি সিনেমার কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। তবে প্রধান চরিত্রের অভিনয়শিল্পী হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরে একদিন শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বসে একটি তেলবাহী জাহাজ দেখে নতুন গল্পের ভাবনা আসে তাঁর মাথায়। এরপর কয়েকদিন জাহাজে যাতায়াত করে বাস্তব অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই চিত্রনাট্য সম্পন্ন করেন।

২০১৯ সালের মার্চে একই জাহাজে শুরু হয় সিনেমাটির শুটিং। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ হওয়ায় পুরো কাজ শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যায়। অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে সেন্সর সনদ পাওয়ার পর এ বছর দর্শকদের জন্য মুক্তি পেয়েছে ‘মাস্তুল’।

সংলাপ ছাড়াই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে বাবু

মুক্তির আগে রাজধানীর রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। সিনেমাটিতে তাঁর চরিত্রটির কোনো সংলাপ নেই। এ বিষয়ে তিনি বলেন, একজন অভিনেতার জন্য সংলাপই সব নয়; বরং চরিত্রের অনুভূতি, অভিব্যক্তি এবং মানসিক যাত্রাই অভিনয়ের আসল শক্তি।

কাস্টিং নিয়ে নির্মাতার ভিন্ন দর্শন

চরিত্র নির্বাচনের বিষয়ে মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বলেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কল্পনায় থাকা চরিত্রের সঙ্গে অভিনেতার উপস্থিতি ও ব্যক্তিত্বের মিল। বিশেষ করে ‘সুকানি’ চরিত্রটির জন্য অনেক পরিচিত অভিনেতার অডিশন নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দীপক সুমনকে নির্বাচন করা হয়।

‘যে সিনেমা দেখতে চাই, সেটাই বানাই’

নির্মাতার বিশ্বাস, বাণিজ্যিক ধারার বাইরে চিন্তাশীল ও বাস্তবধর্মী সিনেমার দর্শক বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাড়ছে। তাই তিনি এমন গল্পই পর্দায় তুলে ধরতে চান, যা তিনি নিজেও একজন দর্শক হিসেবে দেখতে আগ্রহী।

প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশেষ প্রদর্শনীতে

বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের সিনেমাটির প্রশংসা করে বলেন, এটি অনেকটা প্রামাণ্যচিত্রের বাস্তবতার অনুভূতি তৈরি করলেও ভেতরে রয়েছে শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী একটি গল্প। বিশেষ করে নদী ও বন্দরকেন্দ্রিক জীবনচিত্র দর্শকদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে

মুক্তির আগেই ‘মাস্তুল’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছে। ৪৭তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিয়ে সিনেমাটি ‘স্পেশাল মেনশন’ সম্মান অর্জন করে।

সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন আমিনুর রহমান ও আরিফ হাসান। চিত্রগ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান, শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন হুসনাইন লিঙ্কন এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন চৈতন্য রাজবংশী। প্রচারণার গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন লাবিক কামাল গৌরব।

বর্তমানে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে ‘মাস্তুল’। স্টার সিনেপ্লেক্স (বসুন্ধরা ও নারায়ণগঞ্জ শাখা), যমুনা ব্লকবাস্টার, লায়ন সিনেমাস এবং নারায়ণগঞ্জ সিনেস্কোপে দর্শকরা সিনেমাটি উপভোগ করতে পারছেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

‘আম কাঁঠালের ছুটি’র পর নতুন চমক, নদী-বন্দরের জীবন নিয়ে নূরুজ্জামানের ‘মাস্তুল’

আপডেট সময় ০২:৩৯:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

তিন বছর আগে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ নির্মাণ করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী নির্মাতা হিসেবে আলোচনায় আসেন মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। এবার তিনি দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহের নতুন চলচ্চিত্র ‘মাস্তুল’ নিয়ে। শুক্রবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় নদী, বন্দর এবং ভাসমান মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে আবেগঘন এক গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

‘মাস্তুল’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি তেলবাহী জাহাজের বৃদ্ধ পাচক এবং বন্দর এলাকায় বসবাসকারী এক পথশিশুকে ঘিরে। তাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একাকীত্ব, মমতা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানবিকতার নানা দিক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা।

শীতলক্ষ্যার তীর থেকে গল্পের জন্ম

নির্মাতা জানান, ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র পর তিনি অন্য একটি সিনেমার কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। তবে প্রধান চরিত্রের অভিনয়শিল্পী হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরে একদিন শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বসে একটি তেলবাহী জাহাজ দেখে নতুন গল্পের ভাবনা আসে তাঁর মাথায়। এরপর কয়েকদিন জাহাজে যাতায়াত করে বাস্তব অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই চিত্রনাট্য সম্পন্ন করেন।

২০১৯ সালের মার্চে একই জাহাজে শুরু হয় সিনেমাটির শুটিং। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ হওয়ায় পুরো কাজ শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যায়। অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে সেন্সর সনদ পাওয়ার পর এ বছর দর্শকদের জন্য মুক্তি পেয়েছে ‘মাস্তুল’।

সংলাপ ছাড়াই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে বাবু

মুক্তির আগে রাজধানীর রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। সিনেমাটিতে তাঁর চরিত্রটির কোনো সংলাপ নেই। এ বিষয়ে তিনি বলেন, একজন অভিনেতার জন্য সংলাপই সব নয়; বরং চরিত্রের অনুভূতি, অভিব্যক্তি এবং মানসিক যাত্রাই অভিনয়ের আসল শক্তি।

কাস্টিং নিয়ে নির্মাতার ভিন্ন দর্শন

চরিত্র নির্বাচনের বিষয়ে মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বলেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কল্পনায় থাকা চরিত্রের সঙ্গে অভিনেতার উপস্থিতি ও ব্যক্তিত্বের মিল। বিশেষ করে ‘সুকানি’ চরিত্রটির জন্য অনেক পরিচিত অভিনেতার অডিশন নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দীপক সুমনকে নির্বাচন করা হয়।

‘যে সিনেমা দেখতে চাই, সেটাই বানাই’

নির্মাতার বিশ্বাস, বাণিজ্যিক ধারার বাইরে চিন্তাশীল ও বাস্তবধর্মী সিনেমার দর্শক বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাড়ছে। তাই তিনি এমন গল্পই পর্দায় তুলে ধরতে চান, যা তিনি নিজেও একজন দর্শক হিসেবে দেখতে আগ্রহী।

প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশেষ প্রদর্শনীতে

বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের সিনেমাটির প্রশংসা করে বলেন, এটি অনেকটা প্রামাণ্যচিত্রের বাস্তবতার অনুভূতি তৈরি করলেও ভেতরে রয়েছে শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী একটি গল্প। বিশেষ করে নদী ও বন্দরকেন্দ্রিক জীবনচিত্র দর্শকদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে

মুক্তির আগেই ‘মাস্তুল’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছে। ৪৭তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিয়ে সিনেমাটি ‘স্পেশাল মেনশন’ সম্মান অর্জন করে।

সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন আমিনুর রহমান ও আরিফ হাসান। চিত্রগ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান, শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন হুসনাইন লিঙ্কন এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন চৈতন্য রাজবংশী। প্রচারণার গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন লাবিক কামাল গৌরব।

বর্তমানে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে ‘মাস্তুল’। স্টার সিনেপ্লেক্স (বসুন্ধরা ও নারায়ণগঞ্জ শাখা), যমুনা ব্লকবাস্টার, লায়ন সিনেমাস এবং নারায়ণগঞ্জ সিনেস্কোপে দর্শকরা সিনেমাটি উপভোগ করতে পারছেন।