‘আত্মগোপন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি’—ভারত থেকে নানকের বিস্ফোরক বক্তব্য
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও দু’বারের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার-কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের আত্মগোপন জীবন, শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
সাক্ষাৎকারে নানক বলেন, রাজনীতি তাঁর কাছে কেবল পেশা নয়, একটি পরিবার। দলের নেতাকর্মীরা বিপর্যয়ের মধ্যে থাকলে ব্যক্তিগতভাবে শান্তিতে থাকা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি দাবি করেন, ছাত্রজীবন থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অতীতেও একাধিকবার আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে।
২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি গভীর আবেগ প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, এসব ঘটনা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের কবর জিয়ারত করতে না পারার কষ্টের কথাও তুলে ধরেন।
কীভাবে দেশ ছাড়লেন—এ প্রশ্নের জবাবে নানক জানান, ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তিনি একাধিকবার আশ্রয় পরিবর্তন করেন এবং পরে পরিবারের পরামর্শে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের শিলংয়ে যান। সেখান থেকে মালদহ হয়ে কলকাতায় পৌঁছান বলে জানান তিনি।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে নানক বলেন, তাঁর মতে ওই সময় শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তা বড় বিষয় ছিল। তিনি দাবি করেন, সময়মতো সরে না গেলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা এখন ভারতে নিরাপদ আছেন এবং নিয়মিত খোঁজখবর নেন দলের নেতাকর্মীদের।
আওয়ামী লীগের পতনের কারণ সম্পর্কে নানক বলেন, দলটি একটি ‘গভীর ষড়যন্ত্রের’ শিকার হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, সরকারপ্রধান আগেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করেছিলেন এবং দলকে সতর্কও করেছিলেন। তবে দলীয় দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।
কলকাতায় আওয়ামী লীগের গোপন কার্যালয় রয়েছে—এমন আলোচনাকে তিনি ‘মুখরোচক’ বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর দাবি, সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক দলীয় অফিস নেই। তবে পরিচিতজনদের দেওয়া কোনো জায়গায় বসে আলোচনা বা সময় কাটানোকে তিনি অস্বাভাবিক মনে করেন না।
নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রসঙ্গে নানক বলেন, তিনি আইনগত ও কৌশলগতভাবে লড়াই করছেন। তাঁর দাবি, অভিযোগপত্রে নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হলেও কোথাও প্রত্যক্ষ উপস্থিতি বা গুলি চালানোর প্রমাণ দেখানো হয়নি। তিনি বিশ্বাস করেন, আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করলে এসব মামলা টিকবে না।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান নেন নানক। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁরাও ফিরবেন বলে জানান তিনি। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁকে আবার দেখা যাবে কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্ত জবাব দেন, “বেঁচে থাকলে দেখা যাবে।”
এই সাক্ষাৎকারে জাহাঙ্গীর কবির নানক শুধু নিজের অবস্থানই ব্যাখ্যা করেননি; বরং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে দলের ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন।























