ঢাকা ১১:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর নৌকায় ১১ জনের মৃত্যুর দাবি, ৯ জনই বাংলাদেশি

নিজস্ব সংবাদ :

গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া একটি নৌকা ইঞ্জিন বিকল হয়ে প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছেছে। খাবার ও পানির সংকট এবং তীব্র গরমে নৌকাটিতে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন উদ্ধার হওয়া এক বাংলাদেশি। নিহতদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আবদুল করিমের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে এসব তথ্য জানতে পারে কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে দূতাবাস জানিয়েছে, মিশরের পুলিশ এখনো সাগরে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পায়নি।

দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জনকে নিয়ে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পর নৌযানটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় জ্বালানিও।

এরপর কোনো খাবার ও পর্যাপ্ত পানি ছাড়াই নৌকাটি প্রায় ১১ দিন সাগরে ভাসতে থাকে। অবশেষে ১৩ আগস্ট মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে নৌকাটি পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

পরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ জনকে দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উদ্ধার হওয়া অনেক যাত্রী তখন অচেতন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে তারা পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আবদুল করিমের দাবি, প্রচণ্ড গরম, খাবার ও পানির অভাবে নৌকায় থাকা অন্তত ১১ জন মারা যান। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, পরে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও করিম একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রীর জায়গা থাকলেও সেখানে ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল। পুরো নৌযানে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।

দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থাও গুরুতর বলে জানিয়েছেন করিম। তার দাবি, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে অনেকের শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে।

তবে মৃত্যুর দাবির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি মিশরের কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মো. জাকির হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

এদিকে, এই নৌযাত্রার পর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচ যুবকের পরিবারের সদস্যরা এখনো তাদের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।

হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে পরিবারের কথা হয়। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ৩ আগস্ট গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। ওই দিন লিবিয়া থেকে দুটি নৌকা ছাড়ার কথা জানা যায়। পরে প্রথম নৌকার এক যাত্রী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, হৃদয় দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। এরপর থেকেই তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় এই ঘটনায় আবারও উঠে এসেছে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও অনিরাপদ নৌযাত্রার ভয়াবহ ঝুঁকি। তবে সাগরে মৃত্যুর সংখ্যা ও নিখোঁজদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর নৌকায় ১১ জনের মৃত্যুর দাবি, ৯ জনই বাংলাদেশি

আপডেট সময় ০৮:১৬:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া একটি নৌকা ইঞ্জিন বিকল হয়ে প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছেছে। খাবার ও পানির সংকট এবং তীব্র গরমে নৌকাটিতে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন উদ্ধার হওয়া এক বাংলাদেশি। নিহতদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

মিশরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আবদুল করিমের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে এসব তথ্য জানতে পারে কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে দূতাবাস জানিয়েছে, মিশরের পুলিশ এখনো সাগরে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পায়নি।

দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জনকে নিয়ে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পর নৌযানটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় জ্বালানিও।

এরপর কোনো খাবার ও পর্যাপ্ত পানি ছাড়াই নৌকাটি প্রায় ১১ দিন সাগরে ভাসতে থাকে। অবশেষে ১৩ আগস্ট মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে নৌকাটি পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

পরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ জনকে দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উদ্ধার হওয়া অনেক যাত্রী তখন অচেতন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে তারা পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আবদুল করিমের দাবি, প্রচণ্ড গরম, খাবার ও পানির অভাবে নৌকায় থাকা অন্তত ১১ জন মারা যান। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, পরে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও করিম একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রীর জায়গা থাকলেও সেখানে ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল। পুরো নৌযানে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।

দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থাও গুরুতর বলে জানিয়েছেন করিম। তার দাবি, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে অনেকের শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে।

তবে মৃত্যুর দাবির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি মিশরের কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মো. জাকির হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

এদিকে, এই নৌযাত্রার পর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচ যুবকের পরিবারের সদস্যরা এখনো তাদের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।

হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে পরিবারের কথা হয়। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ৩ আগস্ট গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। ওই দিন লিবিয়া থেকে দুটি নৌকা ছাড়ার কথা জানা যায়। পরে প্রথম নৌকার এক যাত্রী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, হৃদয় দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। এরপর থেকেই তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় এই ঘটনায় আবারও উঠে এসেছে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও অনিরাপদ নৌযাত্রার ভয়াবহ ঝুঁকি। তবে সাগরে মৃত্যুর সংখ্যা ও নিখোঁজদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।