ঢাকা ০২:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আপসহীন নেত্রীর ৮২তম জন্মদিন আজ: সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে খালেদা জিয়া

নিজস্ব সংবাদ :

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্রের আন্দোলন, বিএনপির নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা দেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ ফেলেছে। আজ ১৫ আগস্ট, তাঁর ৮২তম জন্মবার্ষিকী। তবে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এবারই প্রথম তাঁর অনুপস্থিতিতে জন্মদিন পালন করছে দল ও তাঁর অনুসারীরা।

বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার জন্ম অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের পরিবারে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুলের শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে দিনাজপুরে। সেখানেই তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্বামীর কর্মস্থলের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানেও অবস্থান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পর খালেদা জিয়ার জীবনেও নেমে আসে কঠিন সময়। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সন্তানসহ বন্দিত্বের ঘটনাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে নতুন করে আবির্ভূত হন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন তিনি। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। এর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়েও একাধিকবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা আন্দোলন, মামলা, কারাবাস ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক দীর্ঘ অধ্যায়। বিশেষ করে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারাবন্দিত্বসহ নানা সংকটের মুখোমুখি হন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। পরে ২০২০ সালে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থতার মধ্যেও রাজনৈতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রেই ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের দিন রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁর মুক্তির পথ খুলে যায়। এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশেও নেওয়া হয় তাঁকে।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায়। মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি ঘটে। দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তাঁর প্রতি ব্যাপক শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির দাবি, দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও তিনি দলকে সংগঠিত করেছেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর সরকার পরিচালনার দায়িত্বও তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের হাতে আসে।

এদিকে খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আজ দেশব্যাপী দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের কর্মসূচি নিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

জন্মদিনে এবার খালেদা জিয়া নেই—আছে তাঁর স্মৃতি, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা এবং রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর কয়েক দশকের ভূমিকা ভবিষ্যতেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

আপসহীন নেত্রীর ৮২তম জন্মদিন আজ: সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে খালেদা জিয়া

আপডেট সময় ০৬:৩৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্রের আন্দোলন, বিএনপির নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা দেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ ফেলেছে। আজ ১৫ আগস্ট, তাঁর ৮২তম জন্মবার্ষিকী। তবে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এবারই প্রথম তাঁর অনুপস্থিতিতে জন্মদিন পালন করছে দল ও তাঁর অনুসারীরা।

বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার জন্ম অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের পরিবারে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুলের শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে দিনাজপুরে। সেখানেই তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্বামীর কর্মস্থলের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানেও অবস্থান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পর খালেদা জিয়ার জীবনেও নেমে আসে কঠিন সময়। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সন্তানসহ বন্দিত্বের ঘটনাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে নতুন করে আবির্ভূত হন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন তিনি। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। এর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়েও একাধিকবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা আন্দোলন, মামলা, কারাবাস ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক দীর্ঘ অধ্যায়। বিশেষ করে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারাবন্দিত্বসহ নানা সংকটের মুখোমুখি হন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। পরে ২০২০ সালে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থতার মধ্যেও রাজনৈতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রেই ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের দিন রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁর মুক্তির পথ খুলে যায়। এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশেও নেওয়া হয় তাঁকে।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায়। মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি ঘটে। দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তাঁর প্রতি ব্যাপক শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির দাবি, দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও তিনি দলকে সংগঠিত করেছেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর সরকার পরিচালনার দায়িত্বও তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের হাতে আসে।

এদিকে খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আজ দেশব্যাপী দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের কর্মসূচি নিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

জন্মদিনে এবার খালেদা জিয়া নেই—আছে তাঁর স্মৃতি, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা এবং রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর কয়েক দশকের ভূমিকা ভবিষ্যতেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।