তাপমাত্রা বাড়তেই বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত দেশ
শিডিউল ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, কৃষি-শিল্প-পোলট্রি-জেলেদের ওপর তীব্র প্রভাব
সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরই দেশে আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ সংকট। গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে কৃষি, ব্যবসা, শিল্প উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।
রংপুর, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল অঞ্চলে ভোগান্তির মাত্রা তুলনামূলক বেশি বলে বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তীব্র গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন।
রেকর্ড ছুঁইছুঁই বিদ্যুতের ঘাটতি
বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত অধিকাংশ সময় লোডশেডিং ছিল তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। কিছু সময়ে তা কমলেও আড়াই হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামেনি। খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকৃত ঘাটতি চার হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
রোববার সন্ধ্যায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সেই সময় ঘাটতি মেটাতে দুই হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। বিকেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যখন চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বেড়ে তিন হাজার ছয়শ মেগাওয়াটেরও বেশি হয়।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে তিন হাজার পাঁচশ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উচ্চমাত্রার ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংকটের মূল কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুটে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। ভারতের আদানি গ্রুপ থেকেও আগের তুলনায় কম বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
বিভিন্ন অঞ্চলের দুর্ভোগ
রাজশাহীতে কৃষিকাজ ব্যাহত
বাঘা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় সেচ, ধান শুকানো ও অন্যান্য কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও ফ্রিজ, মেশিন ও দোকান পরিচালনায় সমস্যায় পড়েছেন।
যশোরে পোলট্রি খামারে মুরগি মারা গেছে
অভয়নগরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় একটি খামারে চার শতাধিক মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। খামারিদের ভাষ্য, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় এ ক্ষতি হয়েছে।
কলাপাড়ায় বরফ সংকটে জেলেরা বিপাকে
আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক দামের দ্বিগুণে বরফ বিক্রি হলেও অনেক জেলে প্রয়োজনীয় বরফ পাচ্ছেন না। ফলে ইলিশ মৌসুমে শত শত ট্রলার ঘাটে আটকে আছে।
সুনামগঞ্জে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেই
গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার এবং ছোট ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রংপুরে হাসপাতাল ও ছোট কারখানায় প্রভাব
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিদ্যুৎনির্ভর ছোট শিল্পকারখানাগুলো অতিরিক্ত ব্যয় বহন করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সিলেটে সরবরাহ কম, ঘাটতি বেড়েছে
চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং করা হচ্ছে।
গ্যাস সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। বর্তমানে টার্মিনালটি আংশিক চালু থাকলেও আগের সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
দুর্ঘটনার আগে প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে তা কিছুটা বেড়ে ২৩৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছালেও দেশের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হওয়ায় এখনও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের দাবি
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জনভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সংগঠন অন্তত নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করে পরিকল্পিতভাবে লোডশেডিং করার দাবি জানিয়েছেন, যাতে মানুষ আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি, বিকল বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত মেরামত এবং আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে বিদ্যুৎ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

























