ঢাকা ০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য নিরাপদে বিদেশে, কারাগারে আওয়ামী লীগের বহু নেতা

নিজস্ব সংবাদ :

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফোনালাপ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই কথোপকথনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে শেখ হাসিনার কাছে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চাইতে শোনা যায়।

প্রচারিত অডিও অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে তাপস ফোন করে বলেন, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান এবং বিমানবন্দরে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনা তাকে যেতে আপত্তি নেই বলে জানান। পরে দুজনের মধ্যে আরও কিছু আলোচনা হয়। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ইমিগ্রেশন পর্যায়ে জটিলতার মুখে পড়ে তাপস এই যোগাযোগ করেছিলেন।

উত্তাল সময়, হঠাৎ বিদেশযাত্রার চেষ্টা

ওই সময় সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। রাজধানী ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল।

৩ আগস্ট বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশে সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিয়ে আপত্তির আলোচনা সামনে আসে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়।

সরকারের পতনের পর স্বজনদের সরে যাওয়া

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা এবং সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক। এরপর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক আত্মীয়-স্বজনও দেশ ত্যাগ করেন বলে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই বিদেশে ছিলেন। শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) বিদেশে অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়। রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য।

আত্মীয়দের বড় অংশ ভারতে

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী কয়েকজন সদস্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ তন্ময়, নূর-ই-আলম চৌধুরী ও নিক্সন চৌধুরীর নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। কলকাতার নিউ টাউনসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের অবস্থানের খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

বরিশাল অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও ভারতমুখী হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ক্ষেত্রেও ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আলোচনা রয়েছে।

সীমান্তপথ নিয়ে নানা আলোচনা

দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে কেউ কেউ দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং অর্থের বিনিময়ে এ প্রক্রিয়া সহজ হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, যদিও এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতারা

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হন। রাজনৈতিক মহলে আলোচিত তথ্য অনুযায়ী, তিন ডজনের মতো সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং ৫০ জনের বেশি সাবেক সংসদ সদস্য বিভিন্ন মামলায় আটক হন।

গ্রেপ্তার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ। এছাড়া শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও কারাগারে রয়েছেন।

এ সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পাওয়া সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও দবিরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন দিনাজপুর জেলা কারাগারে এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুও দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তৃণমূলের ক্ষোভ ও ভাঙনের প্রশ্ন

শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যদের বড় অংশ নিরাপদে বিদেশে চলে যেতে পারলেও আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী দেশে থেকে যান। তাঁদের অনেকেই গ্রেপ্তার, মামলা বা আত্মগোপনের ঝুঁকিতে পড়েন। এ নিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন।

রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক শাসনের দুটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষমতার প্রতি প্রবল আসক্তি এবং আত্মীয়স্বজনকেন্দ্রিক প্রভাব বলয়। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসন ধীরে ধীরে একটি পারিবারিক ক্ষমতা কাঠামোয় রূপ নেয়, যেখানে আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী পদধারীরা সর্বাধিক সুবিধা ভোগ করেছেন। অন্যদিকে সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা রাজনৈতিক সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বহন করেছেন।

তিনি আরও মনে করেন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও আত্মীয়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে।

আলোচনার কেন্দ্রে সেই ফোনকল

তাপসের কথিত ফোনালাপ এখন শুধু একটি অডিও রেকর্ড নয়, বরং আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের অস্থিরতা, ক্ষমতার ভেতরের উদ্বেগ এবং পতনের আগ মুহূর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে থাকবে।

একদিকে সরকারের পতনের আগে প্রভাবশালী স্বজনদের নিরাপদ সরে যাওয়ার আলোচনা, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতার গ্রেপ্তার—এই দুই বিপরীত চিত্রই ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য নিরাপদে বিদেশে, কারাগারে আওয়ামী লীগের বহু নেতা

আপডেট সময় ০৩:১৪:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফোনালাপ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই কথোপকথনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে শেখ হাসিনার কাছে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চাইতে শোনা যায়।

প্রচারিত অডিও অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে তাপস ফোন করে বলেন, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান এবং বিমানবন্দরে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনা তাকে যেতে আপত্তি নেই বলে জানান। পরে দুজনের মধ্যে আরও কিছু আলোচনা হয়। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ইমিগ্রেশন পর্যায়ে জটিলতার মুখে পড়ে তাপস এই যোগাযোগ করেছিলেন।

উত্তাল সময়, হঠাৎ বিদেশযাত্রার চেষ্টা

ওই সময় সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। রাজধানী ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল।

৩ আগস্ট বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশে সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সময়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিয়ে আপত্তির আলোচনা সামনে আসে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়।

সরকারের পতনের পর স্বজনদের সরে যাওয়া

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা এবং সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক। এরপর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক আত্মীয়-স্বজনও দেশ ত্যাগ করেন বলে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই বিদেশে ছিলেন। শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) বিদেশে অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়। রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য।

আত্মীয়দের বড় অংশ ভারতে

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী কয়েকজন সদস্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ তন্ময়, নূর-ই-আলম চৌধুরী ও নিক্সন চৌধুরীর নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। কলকাতার নিউ টাউনসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের অবস্থানের খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

বরিশাল অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও ভারতমুখী হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ক্ষেত্রেও ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আলোচনা রয়েছে।

সীমান্তপথ নিয়ে নানা আলোচনা

দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে কেউ কেউ দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং অর্থের বিনিময়ে এ প্রক্রিয়া সহজ হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, যদিও এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতারা

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হন। রাজনৈতিক মহলে আলোচিত তথ্য অনুযায়ী, তিন ডজনের মতো সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং ৫০ জনের বেশি সাবেক সংসদ সদস্য বিভিন্ন মামলায় আটক হন।

গ্রেপ্তার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ। এছাড়া শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও কারাগারে রয়েছেন।

এ সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পাওয়া সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও দবিরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন দিনাজপুর জেলা কারাগারে এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুও দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তৃণমূলের ক্ষোভ ও ভাঙনের প্রশ্ন

শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যদের বড় অংশ নিরাপদে বিদেশে চলে যেতে পারলেও আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী দেশে থেকে যান। তাঁদের অনেকেই গ্রেপ্তার, মামলা বা আত্মগোপনের ঝুঁকিতে পড়েন। এ নিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন।

রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক শাসনের দুটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষমতার প্রতি প্রবল আসক্তি এবং আত্মীয়স্বজনকেন্দ্রিক প্রভাব বলয়। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসন ধীরে ধীরে একটি পারিবারিক ক্ষমতা কাঠামোয় রূপ নেয়, যেখানে আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী পদধারীরা সর্বাধিক সুবিধা ভোগ করেছেন। অন্যদিকে সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা রাজনৈতিক সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বহন করেছেন।

তিনি আরও মনে করেন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও আত্মীয়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে।

আলোচনার কেন্দ্রে সেই ফোনকল

তাপসের কথিত ফোনালাপ এখন শুধু একটি অডিও রেকর্ড নয়, বরং আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের অস্থিরতা, ক্ষমতার ভেতরের উদ্বেগ এবং পতনের আগ মুহূর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে থাকবে।

একদিকে সরকারের পতনের আগে প্রভাবশালী স্বজনদের নিরাপদ সরে যাওয়ার আলোচনা, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতার গ্রেপ্তার—এই দুই বিপরীত চিত্রই ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।