শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা–দিল্লি টানাপোড়েন: প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দুই বছরের কূটনৈতিক সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদন
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখন শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে চাইলেও দিল্লি এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আলোকে বিবেচনার কথা বলে আসছে।
গত দুই বছরে এই ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ধরনের অস্বস্তি ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশের জন্ম দিয়েছে।
দিল্লির কাছে ঢাকার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ
বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে একাধিকবার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচার সম্পন্ন করতে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন—এমন অবস্থান থেকেই ঢাকা বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে উত্থাপন করছে।
সবশেষ ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর দিল্লিতে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একই ধরনের নোট ভারবাল ও কূটনৈতিক বার্তা ভারতের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত ভারত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।
সম্পর্কের অগ্রাধিকারে নতুন বাস্তবতা
এক সময় নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগে ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে কাজ করলেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশ এখন সার্বভৌমত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের বিবেচনায় রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা ইস্যু এই দুই ভিন্ন অগ্রাধিকারের মধ্যকার সংবেদনশীল সংযোগস্থলে অবস্থান করছে।
ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা
সম্প্রতি শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।
এই ঘোষণার পর নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তিনি কি ভারতের আনুষ্ঠানিক সহযোগিতায় দেশে ফিরবেন, নাকি নিজ উদ্যোগে সীমান্ত অতিক্রম করবেন?
ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতি নিয়েও আলোচনা
ভারতের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ভার্চ্যুয়ালি অংশ নিতে পারেন। এ খবর প্রকাশের পর বিষয়টি কূটনৈতিক আলোচনায়ও গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের আশঙ্কা, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতীয় পার্লামেন্টে উত্থাপিত প্রশ্ন
বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতের পার্লামেন্টেও আলোচনায় এসেছে। ৩০ জুলাই ভারত সরকার সংসদের উভয় কক্ষে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানায়, বাংলাদেশের অনুরোধ বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ দেয়নি এবং ভারতীয় ভূখণ্ড রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হয়নি। সংসদীয় কমিটি সরকারের এই ব্যাখ্যায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
দিল্লির সিদ্ধান্ত কীসের ওপর নির্ভর করবে?
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে—
- বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত,
- শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রকৃতি,
- অভিযোগের আইনি ভিত্তি,
- রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার প্রশ্ন,
- এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল বলেন, অনুরোধটি বিচারিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ
বাংলাদেশ সরকার ও রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যকে ‘উসকানিমূলক’ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে বিচারপ্রক্রিয়া, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ঢাকার অবস্থান হলো, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া উচিত নয় যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে গত ৩ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সহযোগিতা করবে যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত থাকলেও তিনি ভার্চ্যুয়াল বক্তব্য, দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশের অভিযোগ, এসব কার্যক্রম দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে এবং অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দিল্লি সফরে প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল দিল্লি সফরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেন।
সরকারের প্রত্যাশা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তার মতে, বাংলাদেশ বারবার যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করছে, ভারত তার ইতিবাচক জবাব দেবে বলে আশা করা যায়।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের লক্ষ্য হলো শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
কূটনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে শেখ হাসিনা
দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে, শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচিত ব্যক্তি নন; তিনি ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়েছেন।
বাংলাদেশ তাকে আইনের আওতায় আনতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে, আর ভারত আইনি বাধ্যবাধকতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।
ফলে প্রত্যর্পণ প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শেখ হাসিনা ইস্যু বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

























