ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৯৩৮ বিশ্বকাপ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শেষ ফুটবল মহাযুদ্ধ

নিজস্ব সংবাদ :

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৩৮ সালের আসর শুধু একটি টুর্নামেন্ট ছিল না। এটি ছিল এক অস্থির পৃথিবীর মাঝে ফুটবলের শেষ বড় উৎসব। ইউরোপ তখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছিল প্রতিদিন। ঠিক এমন সময়েই অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় ফিফা বিশ্বকাপ, যা পরে ইতিহাসে পরিচিত হয় “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শেষ বিশ্বকাপ” হিসেবে।

১৯৩৮ সালের এই আসরের পর টানা ১২ বছর বিশ্বকাপ বন্ধ ছিল। যুদ্ধের আগুনে পুড়ে গিয়েছিল পুরো পৃথিবী। তাই এই বিশ্বকাপ আজও ফুটবল ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়।

ফ্রান্সে বসেছিল বিশ্বকাপের আসর

১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় ইউরোপের দেশ France। টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হয় ৪ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত।মোট ১৫টি দল অংশ নেয় এই আসরে। আসলে ১৬টি দলের জন্য সূচি তৈরি হয়েছিল, কিন্তু Austria নাৎসি জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পর তাদের দল বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে টুর্নামেন্ট শুরু হয় ১৫ দল নিয়ে।

সেই সময় বিশ্বকাপের ফরম্যাট ছিল একেবারে ভিন্ন। গ্রুপ পর্ব ছিল না। শুরু থেকেই নকআউট পদ্ধতিতে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো। একটি ম্যাচ ড্র হলে রিপ্লে ম্যাচ আয়োজন করা হতো।

ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দ্বন্দ্ব

১৯৩০ এবং ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের পর ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আয়োজক নির্বাচন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।১৯৩৮ সালে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। এতে ক্ষুব্ধ হয় অনেক দক্ষিণ আমেরিকান দেশ। প্রতিবাদ হিসেবে শক্তিশালী দল Argentina বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি।ফলে অনেকেই মনে করেন, সেই সময়ের অন্যতম সেরা কয়েকটি দলকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৮ বিশ্বকাপ।

ইতালির আধিপত্য

এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী দল ছিল Italy। তারা ছিল ১৯৩৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।প্রথম ম্যাচে ইতালি ২-১ গোলে হারায় Norwayকে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক Franceকে পরাজিত করে সেমিফাইনালে ওঠে।

সেমিফাইনালে ইতালির সামনে ছিল শক্তিশালী Brazil। ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ। তবে অভিজ্ঞতার কাছে হার মানে ব্রাজিল। ইতালি ২-১ গোলে জয় পেয়ে ফাইনালে উঠে যায়।

ব্রাজিলের উত্থানের সূচনা

যদিও ব্রাজিল শিরোপা জিততে পারেনি, তবুও এই বিশ্বকাপ তাদের জন্য ছিল বিশেষ।প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেয় Brazil। দলের তারকা ফুটবলার ছিলেন Leônidas da Silva, যিনি “ব্ল্যাক ডায়মন্ড” নামে পরিচিত ছিলেন।

তিনি পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ মনে করেন, বিশ্বকাপের প্রথম সুপারস্টারদের একজন ছিলেন লিওনিদাস।

ফাইনালে হাঙ্গেরিকে হারিয়ে ইতিহাস

১৯ জুন ১৯৩৮ সালে ফাইনালে মুখোমুখি হয় Italy এবং Hungary।ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় Stade Olympique de Colombes স্টেডিয়ামে।ফাইনালে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। দর্শকরা উপভোগ করেন গোলের বন্যা। শেষ পর্যন্ত ইতালি ৪-২ গোলে জয় পেয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।এই সাফল্যের মাধ্যমে ইতালি প্রথম দল হিসেবে পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়ে।

যুদ্ধের কালো ছায়া

১৯৩৮ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্প মাঠের বাইরেও ছিল।ইউরোপে তখন Adolf Hitler-এর নাৎসি জার্মানির প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছিল। অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, বড় ধরনের সংঘাত সামনে অপেক্ষা করছে।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই শুরু হয় World War II। যুদ্ধ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।ফলে ১৯৩৮ সালের পর ফুটবল বিশ্বকাপ ফিরতে সময় লাগে ১২ বছর।

১২ বছর পর বিশ্বকাপের প্রত্যাবর্তন

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এরপর ১৯৫০ সালে Brazil বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়।তখন নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা মাঠে নামলেও অনেকের মনে তখনও তাজা ছিল ১৯৩৮ সালের স্মৃতি। কারণ সেটিই ছিল এমন এক বিশ্বকাপ, যা একটি যুগের সমাপ্তি এবং আরেকটি অশান্ত যুগের সূচনার সাক্ষী হয়েছিল।

উপসংহার

১৯৩৮ বিশ্বকাপ শুধু ইতালির শিরোপা জয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক টুর্নামেন্ট, যা পৃথিবীর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাঠে ফুটবলের উচ্ছ্বাস থাকলেও চারদিকে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। কেউ তখন জানত না, পরবর্তী বিশ্বকাপ দেখতে অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ ১২ বছর।

তাই ফুটবল ইতিহাসে ১৯৩৮ বিশ্বকাপ আজও বিশেষ। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্বের শেষ ফুটবল উৎসব, যেখানে শেষবারের মতো শান্তির আবহে একত্র হয়েছিল বিশ্বের সেরা ফুটবল দলগুলো।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

১৯৩৮ বিশ্বকাপ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শেষ ফুটবল মহাযুদ্ধ

আপডেট সময় ০৫:১৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৩৮ সালের আসর শুধু একটি টুর্নামেন্ট ছিল না। এটি ছিল এক অস্থির পৃথিবীর মাঝে ফুটবলের শেষ বড় উৎসব। ইউরোপ তখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছিল প্রতিদিন। ঠিক এমন সময়েই অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় ফিফা বিশ্বকাপ, যা পরে ইতিহাসে পরিচিত হয় “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শেষ বিশ্বকাপ” হিসেবে।

১৯৩৮ সালের এই আসরের পর টানা ১২ বছর বিশ্বকাপ বন্ধ ছিল। যুদ্ধের আগুনে পুড়ে গিয়েছিল পুরো পৃথিবী। তাই এই বিশ্বকাপ আজও ফুটবল ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়।

ফ্রান্সে বসেছিল বিশ্বকাপের আসর

১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় ইউরোপের দেশ France। টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হয় ৪ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত।মোট ১৫টি দল অংশ নেয় এই আসরে। আসলে ১৬টি দলের জন্য সূচি তৈরি হয়েছিল, কিন্তু Austria নাৎসি জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পর তাদের দল বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে টুর্নামেন্ট শুরু হয় ১৫ দল নিয়ে।

সেই সময় বিশ্বকাপের ফরম্যাট ছিল একেবারে ভিন্ন। গ্রুপ পর্ব ছিল না। শুরু থেকেই নকআউট পদ্ধতিতে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো। একটি ম্যাচ ড্র হলে রিপ্লে ম্যাচ আয়োজন করা হতো।

ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দ্বন্দ্ব

১৯৩০ এবং ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের পর ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আয়োজক নির্বাচন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।১৯৩৮ সালে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। এতে ক্ষুব্ধ হয় অনেক দক্ষিণ আমেরিকান দেশ। প্রতিবাদ হিসেবে শক্তিশালী দল Argentina বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি।ফলে অনেকেই মনে করেন, সেই সময়ের অন্যতম সেরা কয়েকটি দলকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৮ বিশ্বকাপ।

ইতালির আধিপত্য

এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী দল ছিল Italy। তারা ছিল ১৯৩৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।প্রথম ম্যাচে ইতালি ২-১ গোলে হারায় Norwayকে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক Franceকে পরাজিত করে সেমিফাইনালে ওঠে।

সেমিফাইনালে ইতালির সামনে ছিল শক্তিশালী Brazil। ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ। তবে অভিজ্ঞতার কাছে হার মানে ব্রাজিল। ইতালি ২-১ গোলে জয় পেয়ে ফাইনালে উঠে যায়।

ব্রাজিলের উত্থানের সূচনা

যদিও ব্রাজিল শিরোপা জিততে পারেনি, তবুও এই বিশ্বকাপ তাদের জন্য ছিল বিশেষ।প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেয় Brazil। দলের তারকা ফুটবলার ছিলেন Leônidas da Silva, যিনি “ব্ল্যাক ডায়মন্ড” নামে পরিচিত ছিলেন।

তিনি পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ মনে করেন, বিশ্বকাপের প্রথম সুপারস্টারদের একজন ছিলেন লিওনিদাস।

ফাইনালে হাঙ্গেরিকে হারিয়ে ইতিহাস

১৯ জুন ১৯৩৮ সালে ফাইনালে মুখোমুখি হয় Italy এবং Hungary।ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় Stade Olympique de Colombes স্টেডিয়ামে।ফাইনালে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। দর্শকরা উপভোগ করেন গোলের বন্যা। শেষ পর্যন্ত ইতালি ৪-২ গোলে জয় পেয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।এই সাফল্যের মাধ্যমে ইতালি প্রথম দল হিসেবে পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়ে।

যুদ্ধের কালো ছায়া

১৯৩৮ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্প মাঠের বাইরেও ছিল।ইউরোপে তখন Adolf Hitler-এর নাৎসি জার্মানির প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছিল। অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, বড় ধরনের সংঘাত সামনে অপেক্ষা করছে।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই শুরু হয় World War II। যুদ্ধ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।ফলে ১৯৩৮ সালের পর ফুটবল বিশ্বকাপ ফিরতে সময় লাগে ১২ বছর।

১২ বছর পর বিশ্বকাপের প্রত্যাবর্তন

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এরপর ১৯৫০ সালে Brazil বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়।তখন নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা মাঠে নামলেও অনেকের মনে তখনও তাজা ছিল ১৯৩৮ সালের স্মৃতি। কারণ সেটিই ছিল এমন এক বিশ্বকাপ, যা একটি যুগের সমাপ্তি এবং আরেকটি অশান্ত যুগের সূচনার সাক্ষী হয়েছিল।

উপসংহার

১৯৩৮ বিশ্বকাপ শুধু ইতালির শিরোপা জয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক টুর্নামেন্ট, যা পৃথিবীর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাঠে ফুটবলের উচ্ছ্বাস থাকলেও চারদিকে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। কেউ তখন জানত না, পরবর্তী বিশ্বকাপ দেখতে অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ ১২ বছর।

তাই ফুটবল ইতিহাসে ১৯৩৮ বিশ্বকাপ আজও বিশেষ। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্বের শেষ ফুটবল উৎসব, যেখানে শেষবারের মতো শান্তির আবহে একত্র হয়েছিল বিশ্বের সেরা ফুটবল দলগুলো।