হাম কমলেও থামছে না শিশুদের দুর্ভোগ, নিউমোনিয়া-ডায়রিয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে হাসপাতালের লড়াই
নিজস্ব সংবাদ :
হামের সংক্রমণ আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও শিশুদের ভোগান্তি এখনো কমেনি। বরং হাম থেকে সেরে ওঠার পর অনেক শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, জ্বর, কাশি এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হামের সংক্রমণ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়ায় পরবর্তী সময়ে এসব জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে বর্তমানে এমন অনেক শিশুর চিকিৎসা চলছে, যারা হাম থেকে সুস্থ হলেও নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিল রোগে ভুগছে। তাদের অনেকেরই অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন হচ্ছে এবং হাসপাতাল ছাড়তে সময় লাগছে।
আট মাস বয়সী রিফাতের গল্প যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। জ্বর, কাশি ও শরীরে র্যাশ নিয়ে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলেও শুরুতে রোগটি শনাক্ত হয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে একাধিক হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইতোমধ্যে তার চিকিৎসায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। হামের সংক্রমণ কমলেও নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার কারণে এখনো তাকে অক্সিজেনের সহায়তায় রাখা হয়েছে।
রিফাতের পরিবারের আর্থিক অবস্থাও দিন দিন সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। সন্তানের চিকিৎসার জন্য তার বাবাকে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে যেতে না পারায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে পরিবারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে ফরিদপুরের ১১ মাস বয়সী জায়ান। প্রায় এক মাস ধরে অসুস্থ এই শিশুর জ্বর ও বমি দিয়ে শুরু হলেও পরে হাম ধরা পড়ে। বর্তমানে হাম নিয়ন্ত্রণে এলেও নিউমোনিয়া, কাশি ও শ্বাসকষ্টের কারণে এখনো তাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। সন্তানের সেবা করতে গিয়ে তার মাও হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মা-ছেলে দুজনই এখন হামমুক্ত হলেও জটিলতা কাটেনি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. অন্তরা জানান, হামের নতুন রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রতিদিনই পোস্ট-মিজেলস বা হাম-পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে। এসব রোগীর বেশিরভাগই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে এবং তাদের অনেকেই নিয়মিত টিকা নেয়নি।
তার ভাষ্য, হামের কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে শিশু সহজেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যেও হাম হতে পারে, তবে তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এম এ বারী বলেন, হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও শিশুদের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। এ সময় পুষ্টিকর ও ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানো, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ছোট শিশুদের নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যেসব শিশু এখনো হামের টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এ সময়ে নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ৬৬০ জন এবং নিশ্চিত হামে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হামের নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭০২ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছেন ৮৪ জন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৩ হাজার ৪৯১ জন। তাদের মধ্যে ৮৯ হাজার ৭৬২ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে সময়মতো টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পর শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।