ঢাকা ১২:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: মৃত বেড়ে ৮

নিজস্ব সংবাদ :

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি এলাকায় একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ও রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আটজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সকাল নয়টার দিকে কারখানার ভেতরে কাজ করার সময় কয়েকজন শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ছয়জনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আরও দুই শ্রমিকের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সীতাকুণ্ড থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর জানান, হাসপাতালে ছয়জনের মরদেহ রাখা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আরও দুইজনকে সেখানে নেওয়া হচ্ছে। এতে নিহতের সংখ্যা আটজনে পৌঁছেছে।

নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭), মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। মনসুর ও নাসির দুই ভাই এবং সবাই ভাটিয়ারি এলাকার বাসিন্দা।

স্থানীয় জেলেরা জানান, সকালে কারখানার ভেতর থেকে তীব্র গ্যাসের গন্ধ বের হতে দেখা যায়। গন্ধ এতটাই তীব্র ছিল যে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা পাশের খাল ব্যবহার করতে পারেননি; তাদের দূরের একটি ঘাটে নৌকা ভেড়াতে হয়।

এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে চিৎকার শুনে লোকজন সেখানে ছুটে যান। তখন কয়েকজন অসুস্থ শ্রমিককে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। পরে ভেতরে আরও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা কারখানায় ভাঙচুর চালায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

কারখানার মালিক মো. মহিউদ্দিন ফোনে জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি জেনেছেন, জাহাজের ভেতরে থাকা কয়েকজন কর্মী বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাবেন বলে জানান।

ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। ট্যাংকের ভেতরে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিপজ্জনক গ্যাস থাকতে পারে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করেই ট্যাংক কাটার কাজ শুরু হওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল মানা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শ্রমিকদের স্বজনরা নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: মৃত বেড়ে ৮

আপডেট সময় ১২:৫৯:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি এলাকায় একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ও রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আটজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সকাল নয়টার দিকে কারখানার ভেতরে কাজ করার সময় কয়েকজন শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ছয়জনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আরও দুই শ্রমিকের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সীতাকুণ্ড থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর জানান, হাসপাতালে ছয়জনের মরদেহ রাখা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আরও দুইজনকে সেখানে নেওয়া হচ্ছে। এতে নিহতের সংখ্যা আটজনে পৌঁছেছে।

নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭), মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। মনসুর ও নাসির দুই ভাই এবং সবাই ভাটিয়ারি এলাকার বাসিন্দা।

স্থানীয় জেলেরা জানান, সকালে কারখানার ভেতর থেকে তীব্র গ্যাসের গন্ধ বের হতে দেখা যায়। গন্ধ এতটাই তীব্র ছিল যে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা পাশের খাল ব্যবহার করতে পারেননি; তাদের দূরের একটি ঘাটে নৌকা ভেড়াতে হয়।

এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে চিৎকার শুনে লোকজন সেখানে ছুটে যান। তখন কয়েকজন অসুস্থ শ্রমিককে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। পরে ভেতরে আরও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা কারখানায় ভাঙচুর চালায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

কারখানার মালিক মো. মহিউদ্দিন ফোনে জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি জেনেছেন, জাহাজের ভেতরে থাকা কয়েকজন কর্মী বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাবেন বলে জানান।

ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। ট্যাংকের ভেতরে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিপজ্জনক গ্যাস থাকতে পারে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করেই ট্যাংক কাটার কাজ শুরু হওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল মানা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শ্রমিকদের স্বজনরা নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।