সালিশে ৫ লাখ টাকা জরিমানা, তবু ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক | নেত্রকোনা
গ্রাম্য সালিশে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়াকে। নেত্রকোনায় ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাতে ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে নেত্রকোনা মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলায় রিপন মিয়াকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ভুক্তভোগী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। অভিযুক্ত রিপন মিয়া নেত্রকোনা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মঞ্জিল মিয়ার ছেলে। যদিও কয়েক বছর ধরে তিনি পার্শ্ববর্তী নন্দুরা গ্রামে বসবাস করছিলেন।
স্থানীয়ভাবে কাঠমিস্ত্রি হিসেবে পরিচিত রিপন ২০১৬ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে পরিচিতি পান। বিভিন্ন সংলাপভিত্তিক ভিডিওর মাধ্যমে তিনি ফেসবুকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার ফেসবুক পেজে প্রায় ১৯ লাখ অনুসারী রয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে রিপন তাদের বাড়িতে যান। সে সময় কিশোরীটি বাড়ির উঠানে রান্নার কাজ করছিল এবং তার বাবা বাজারে ও মা বাইরে কাজে ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, এ সুযোগে রিপন তাকে জোরপূর্বক বাড়ির পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে মেয়েটির চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্ত সেখান থেকে পালিয়ে যান।
পরিবার আরও অভিযোগ করেছে, ভিডিওতে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে রিপন দীর্ঘদিন ধরে মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করতেন। সামাজিক লজ্জার ভয়ে তারা প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।
সালিশ বৈঠক ঘিরে বিতর্ক
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সোমবার রাতে স্থানীয় একটি বাজারে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রিপন অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চান—এমন দাবি করেছেন কয়েকজন উপস্থিত ব্যক্তি। পরে তাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা যায়।
সালিশের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই ধর্ষণের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের নিষ্পত্তি গ্রাম্য সালিশে করার চেষ্টাকে আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন।
মোবাইল বন্ধ, আত্মগোপনে অভিযুক্ত
ঘটনার পর থেকে রিপন মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ ধারণা করছে, তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
অভিযুক্তের স্ত্রী চম্পা আক্তার জানিয়েছেন, তিনি পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানেন না। তার স্বামী নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে ভুক্তভোগীর মা বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারেন এবং মেয়ের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পুলিশের বক্তব্য
নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, “এ ঘটনায় মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের অভিযোগ রাষ্ট্রদণ্ডযোগ্য অপরাধ; এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার কেবল আদালতের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। ঘটনাটি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তাধীন রয়েছে।

























