ঢাকা ০৪:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্তানকে অতিমাত্রায় শাষন ঝুঁকিপূর্ণ

নিজস্ব সংবাদ :

ডা. ফারহানা মোবিন

আমাদের সমাজে অনেক মা বাবা সন্তান কে শিষ্টাচার ও লেখাপড়ার জন্য অতিমাত্রায় শাসন করেন।

সন্তানকে অতিমাত্রায় শাষণ করলে হিতে বিপরীত হবে। আমাদের শিশু কিশোর বয়সে ইন্টারনেট ছিল না। এতো গুলো টিভি চ্যানেল আর সোস্যাল মিডিয়া ছিলনা। আমাদের শিশু কিশোর বয়সের তুলনায় এখনকার শিশু কিশোররা অনেক বেশি বুদ্ধিমান। আমাদের তুলনায় তাদের মেধা চিন্তার বিস্তৃতি বেশি, তাদের আশা, আখাংকা এবং  আত্নসম্মান বোধও অনেক বেশি। 


আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন কোন ভুল করলে বাবা, মা, বড় ভাই এবং বোনের কাছে বকা মারও খেয়েছি। মন খারাপ করে চোখের পানি মুছে নিজেরাই স্বাভাবিক হয়ে যেতাম। কিন্তু এখনকার শিশু কিশোরদের অতিমাত্রায় বকা বা শাষণ করলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা খুব বেশি। 

অসংখ্য অভিভাবক ছেলে মেয়েদের লেখাপাড়া, খাবার, সৃজনশীল কাজ নিয়ে অতিমাত্রায় শাষণ করেন। অনেকের ধারণা মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম, কার্টুনের যুগে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সবার সামনে বকা দেয়া যেতেই পারে। বকা দিলে সন্তান মা বাবার কথা মতো চলবে। ঠিকমতো লেখাপড়া করবে, সঠিক ভাবে পুষ্টিকর  খাবার খাবে। একদিন বকা বা মার খেয়ে চুপ থাকতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন এই ধরনের পরিস্থিতি চলতেই থাকলে সন্তান এক সময় অতিমাত্রায় তিক্ত বিরক্ত হবে। 

গবেষনায় দেখা গেছে যেসব শিশুর অতিমাত্রায় বাবা মায়ের কড়া শাষনের মধ্যে বড় হয়, তারা খুব বেশি আতঙ্কের মধ্যে বড় হয়। এই ধরনের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

তিক্ততা থেকে এসব শিশু কিশোর অধিকাংশ সময়ে তাদের মা বাবা বা বাসার অন্যান্য সদস্যদের সাথেও খারাপ আচরণ করে ফেলে।

সন্তান অতিমাত্রায় দুষ্টামি করলে বা খুব বেশি অবাধ্য হলে তাকে শাসণ করতে হবে। তবে তা সব মানুষের সামনে চিৎকার চেঁচামেচি অপমান অপদস্ত করে নয়।

শিশুদেরকে আদর করে, বার বার বুঝিয়ে বলতে হবে। শিশুদেরকে অতিমাত্রায় বকা দিলে, তাদের সঠিকভাবে মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। তারাও কষ্ট পায়। যেসব শিশু অভিভাবকের কাছ থেকে নিয়মিত অতিমাত্রায়
মধ্য দিয়ে যায়, সেসব শিশুদের মধ্যে আত্নবিশ্বাস কমতে থাকে। তারা একটুতেই ভয় পায়, অনেক সময় বাবা মায়ের কাছে থেকে পাওয়া অতিরিক্ত শাষনের জন্য অন্য মানুষের উপর তিক্ততা বিরক্তি প্রকাশ করে।

বড় হয়ে তারা একা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই ভুল করে। আবার দেখা যায়, বকা খেতে পারে এই ভয়ে বাবা মায়ের কাছে তারা মিথ্যা বলতে থাকে নিয়মিত। 

আবার কিশোর কিশোরী যারা অতিমাত্রায় বকা, শাষনের বেড়াজালে বড় হয়ে তারা অধিকাংশ সময়ে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তারা মনে করে তারা অনেক বড় হয়ে গেছে, বাবা মা তাদের কে বকা দিয়ে তাদের অসম্মান করছেন। 

অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়, কিশোর কিশোরী অতিমাত্রায় বকা, তিরস্কার পেতে পেতে অবিভাকদের সাথে তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত শাষনের জন্য এক পর্যায়ে যেযে সন্তানের আর অভিভাবকদের কথা শুনতে চায়না। মা বাবার সাথে অনেক শিশু কিশোর মারামারিও করে ফেলে।

শিশু বয়সে আপনি খেলনা, মজার খাবার দিয়ে আপনার সন্তানকে বাসায় বসিয়ে রাখতে পারবেন। কিন্তু কিশোর কিশোর বয়সে তার বন্ধু বান্ধবী হবে।

বাসার বাইরে তার নিজের জগত তৈরী হবে। এই বন্ধুগুলোর মধ্যে কে আপনার সন্তানের জন্য উপযুক্ত, কে আপনার সন্তানের জন্য ক্ষতিকর তা আমাদের বুঝতে হবে।

অনেক অভিভাককে দেখা যায়, লেখাপড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজেও পুরস্কার পেতেই হবে। পুরস্তার না পেলে আত্নীয়স্বজনের মধ্যে গ্রহনযোগ্যতা কমে যাবে। সামাজিক অবস্থান উঁচুতে যেয়ে পৌছাবে না। এমন ভ্রান্ত ধারনা থেকে সন্তানকে অতি মাত্রায় চাপ দেয়। ক্লাসের পরীক্ষাতে  আশানুরূপ ফলাফল করতে না পারলে শারীরিক আঘাত, অপমান, অপদস্ত করতে দেখা যায়। এই ধরনের আচরণে বাসার সবচেয়ে ছোট শিশুটাও ভয় পেয়ে যায়।

সন্তানের ভালো রেজাল্টের জন্য তাকে বার বার বোঝাতে হবে। তার লেখাপাড়াতে সহযোগিতা করতে হবে। 
কোন বিষয় কঠিন হলে সেটা ধৈর্য্যরে সাথে পড়াতে হবে। একটা বিষয় কোন এক বেলাতে পড়তে না চাইল সন্তানের সাথে আলোচনা করে, সে যেই বিষয়টা পড়তে চাই, সেই বিষয়টা তাকে পড়ানো উচিৎ। অথবা সে যদি কোন একবেলা পড়ার পরিবর্তে খেলতে চায়, তাহলে তাকে খেলার সুযোগ দেয়া উচিৎ। 

তাদেরকে বকা বা তাদের উপর বিরক্ত হবার পরিবর্তে, যে বিষয় আপনার সন্তান আগে পড়তে চায়, তাকে সেই বিষয় টা পড়তে  দেয়া দরকার। 

আমাদের কে বুঝতে হবে, যে এখনকার ছেলে মেয়েদের রেখাপড়া অনেক কঠিন। তাদের খেলার সুযোগ কম।

আমাদের বয়সে আমরা খেলার অনেক ধরনের সুযোগ পেতাম। আমাদের লেখাপড়াও এতোটা কঠিন ছিলনা। কিন্তু এখনকার ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া অনেক কঠিন। আমাদেরকে শুধুমাত্র তাদের লেখাপড়া নয়, তাদের পারস্পরিক সব কিছু চিন্তা করে তাদেরকে অতিমাত্রায় শাসণ করার পরিবর্তে কিভাবে আমরা তাদের ভালো বন্ধু হবো,  আমাদেরকে সেই চিন্তা করতে হবে।

সন্তানের ভালো বন্ধু হতে পারলে তাদের মন মানসিকতা বুঝতে আমাদের সহজ হবে। তারা তাদের সবকিছু অভিভাবকদের সাথে শেয়ার করবে।

ডা. ফারহানা মোবিন,
ডাইরেক্টর – ডা: ফারহানা মোবিন হেল্থ কেয়ার।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সন্তানকে অতিমাত্রায় শাষন ঝুঁকিপূর্ণ

আপডেট সময় ১১:৫২:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

ডা. ফারহানা মোবিন

আমাদের সমাজে অনেক মা বাবা সন্তান কে শিষ্টাচার ও লেখাপড়ার জন্য অতিমাত্রায় শাসন করেন।

সন্তানকে অতিমাত্রায় শাষণ করলে হিতে বিপরীত হবে। আমাদের শিশু কিশোর বয়সে ইন্টারনেট ছিল না। এতো গুলো টিভি চ্যানেল আর সোস্যাল মিডিয়া ছিলনা। আমাদের শিশু কিশোর বয়সের তুলনায় এখনকার শিশু কিশোররা অনেক বেশি বুদ্ধিমান। আমাদের তুলনায় তাদের মেধা চিন্তার বিস্তৃতি বেশি, তাদের আশা, আখাংকা এবং  আত্নসম্মান বোধও অনেক বেশি। 


আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন কোন ভুল করলে বাবা, মা, বড় ভাই এবং বোনের কাছে বকা মারও খেয়েছি। মন খারাপ করে চোখের পানি মুছে নিজেরাই স্বাভাবিক হয়ে যেতাম। কিন্তু এখনকার শিশু কিশোরদের অতিমাত্রায় বকা বা শাষণ করলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা খুব বেশি। 

অসংখ্য অভিভাবক ছেলে মেয়েদের লেখাপাড়া, খাবার, সৃজনশীল কাজ নিয়ে অতিমাত্রায় শাষণ করেন। অনেকের ধারণা মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম, কার্টুনের যুগে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সবার সামনে বকা দেয়া যেতেই পারে। বকা দিলে সন্তান মা বাবার কথা মতো চলবে। ঠিকমতো লেখাপড়া করবে, সঠিক ভাবে পুষ্টিকর  খাবার খাবে। একদিন বকা বা মার খেয়ে চুপ থাকতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন এই ধরনের পরিস্থিতি চলতেই থাকলে সন্তান এক সময় অতিমাত্রায় তিক্ত বিরক্ত হবে। 

গবেষনায় দেখা গেছে যেসব শিশুর অতিমাত্রায় বাবা মায়ের কড়া শাষনের মধ্যে বড় হয়, তারা খুব বেশি আতঙ্কের মধ্যে বড় হয়। এই ধরনের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

তিক্ততা থেকে এসব শিশু কিশোর অধিকাংশ সময়ে তাদের মা বাবা বা বাসার অন্যান্য সদস্যদের সাথেও খারাপ আচরণ করে ফেলে।

সন্তান অতিমাত্রায় দুষ্টামি করলে বা খুব বেশি অবাধ্য হলে তাকে শাসণ করতে হবে। তবে তা সব মানুষের সামনে চিৎকার চেঁচামেচি অপমান অপদস্ত করে নয়।

শিশুদেরকে আদর করে, বার বার বুঝিয়ে বলতে হবে। শিশুদেরকে অতিমাত্রায় বকা দিলে, তাদের সঠিকভাবে মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। তারাও কষ্ট পায়। যেসব শিশু অভিভাবকের কাছ থেকে নিয়মিত অতিমাত্রায়
মধ্য দিয়ে যায়, সেসব শিশুদের মধ্যে আত্নবিশ্বাস কমতে থাকে। তারা একটুতেই ভয় পায়, অনেক সময় বাবা মায়ের কাছে থেকে পাওয়া অতিরিক্ত শাষনের জন্য অন্য মানুষের উপর তিক্ততা বিরক্তি প্রকাশ করে।

বড় হয়ে তারা একা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই ভুল করে। আবার দেখা যায়, বকা খেতে পারে এই ভয়ে বাবা মায়ের কাছে তারা মিথ্যা বলতে থাকে নিয়মিত। 

আবার কিশোর কিশোরী যারা অতিমাত্রায় বকা, শাষনের বেড়াজালে বড় হয়ে তারা অধিকাংশ সময়ে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তারা মনে করে তারা অনেক বড় হয়ে গেছে, বাবা মা তাদের কে বকা দিয়ে তাদের অসম্মান করছেন। 

অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়, কিশোর কিশোরী অতিমাত্রায় বকা, তিরস্কার পেতে পেতে অবিভাকদের সাথে তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত শাষনের জন্য এক পর্যায়ে যেযে সন্তানের আর অভিভাবকদের কথা শুনতে চায়না। মা বাবার সাথে অনেক শিশু কিশোর মারামারিও করে ফেলে।

শিশু বয়সে আপনি খেলনা, মজার খাবার দিয়ে আপনার সন্তানকে বাসায় বসিয়ে রাখতে পারবেন। কিন্তু কিশোর কিশোর বয়সে তার বন্ধু বান্ধবী হবে।

বাসার বাইরে তার নিজের জগত তৈরী হবে। এই বন্ধুগুলোর মধ্যে কে আপনার সন্তানের জন্য উপযুক্ত, কে আপনার সন্তানের জন্য ক্ষতিকর তা আমাদের বুঝতে হবে।

অনেক অভিভাককে দেখা যায়, লেখাপড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজেও পুরস্কার পেতেই হবে। পুরস্তার না পেলে আত্নীয়স্বজনের মধ্যে গ্রহনযোগ্যতা কমে যাবে। সামাজিক অবস্থান উঁচুতে যেয়ে পৌছাবে না। এমন ভ্রান্ত ধারনা থেকে সন্তানকে অতি মাত্রায় চাপ দেয়। ক্লাসের পরীক্ষাতে  আশানুরূপ ফলাফল করতে না পারলে শারীরিক আঘাত, অপমান, অপদস্ত করতে দেখা যায়। এই ধরনের আচরণে বাসার সবচেয়ে ছোট শিশুটাও ভয় পেয়ে যায়।

সন্তানের ভালো রেজাল্টের জন্য তাকে বার বার বোঝাতে হবে। তার লেখাপাড়াতে সহযোগিতা করতে হবে। 
কোন বিষয় কঠিন হলে সেটা ধৈর্য্যরে সাথে পড়াতে হবে। একটা বিষয় কোন এক বেলাতে পড়তে না চাইল সন্তানের সাথে আলোচনা করে, সে যেই বিষয়টা পড়তে চাই, সেই বিষয়টা তাকে পড়ানো উচিৎ। অথবা সে যদি কোন একবেলা পড়ার পরিবর্তে খেলতে চায়, তাহলে তাকে খেলার সুযোগ দেয়া উচিৎ। 

তাদেরকে বকা বা তাদের উপর বিরক্ত হবার পরিবর্তে, যে বিষয় আপনার সন্তান আগে পড়তে চায়, তাকে সেই বিষয় টা পড়তে  দেয়া দরকার। 

আমাদের কে বুঝতে হবে, যে এখনকার ছেলে মেয়েদের রেখাপড়া অনেক কঠিন। তাদের খেলার সুযোগ কম।

আমাদের বয়সে আমরা খেলার অনেক ধরনের সুযোগ পেতাম। আমাদের লেখাপড়াও এতোটা কঠিন ছিলনা। কিন্তু এখনকার ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া অনেক কঠিন। আমাদেরকে শুধুমাত্র তাদের লেখাপড়া নয়, তাদের পারস্পরিক সব কিছু চিন্তা করে তাদেরকে অতিমাত্রায় শাসণ করার পরিবর্তে কিভাবে আমরা তাদের ভালো বন্ধু হবো,  আমাদেরকে সেই চিন্তা করতে হবে।

সন্তানের ভালো বন্ধু হতে পারলে তাদের মন মানসিকতা বুঝতে আমাদের সহজ হবে। তারা তাদের সবকিছু অভিভাবকদের সাথে শেয়ার করবে।

ডা. ফারহানা মোবিন,
ডাইরেক্টর – ডা: ফারহানা মোবিন হেল্থ কেয়ার।